অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির একটি মূল মিটার থাকে, আর প্রতিটি ফ্ল্যাট বা ইউনিটে বাড়িওয়ালা নিজে সাব-মিটার বসিয়ে দেন। মাস শেষে মূল মিটারের বিল আসে একসঙ্গে, আর সেটি ভাড়াটিয়াদের মধ্যে ভাগ করতে গিয়েই শুরু হয় জটিলতা। কেউ বলেন বেশি ধরা হয়েছে, কেউ জানতে চান সিঁড়ির বাতি বা পানির পাম্পের বিল কে দেবে। একটি পরিষ্কার পদ্ধতি মেনে চললে এসব প্রশ্নের উত্তর সহজেই দেওয়া যায়।

কেন সাধারণ হিসাবে ভুল হয়

বিদ্যুতের বিলে সাধারণত শুধু ইউনিটের দাম থাকে না; ব্যবহারের ধাপ অনুযায়ী ভিন্ন রেট, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাটও যুক্ত হয়। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট রেট ধরে সাব-মিটারের ইউনিট গুণ করলে মোট অঙ্ক মূল বিলের সঙ্গে মেলে না — হয় বাড়িওয়ালার লোকসান হয়, নয়তো ভাড়াটিয়ার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। সবচেয়ে ন্যায্য উপায় হলো মূল বিলের মোট টাকাকে ব্যবহারের অনুপাতে ভাগ করা।

ধাপে ধাপে হিসাবের পদ্ধতি

  1. রিডিং নিন একই দিনে: মূল মিটার ও সব সাব-মিটারের রিডিং একই দিনে, সম্ভব হলে একই সময়ে নিন এবং ছবি তুলে রাখুন।
  2. ইউনিট বের করুন: প্রতিটি মিটারে চলতি রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিন।
  3. কমন ইউনিট বের করুন: মূল মিটারের মোট ইউনিট থেকে সব সাব-মিটারের ইউনিটের যোগফল বাদ দিলে সিঁড়ি, পাম্প, গেটের বাতির মতো কমন ব্যবহারের ইউনিট পাওয়া যায়।
  4. গড় রেট বের করুন: মূল বিলের মোট টাকা ÷ মূল মিটারের মোট ইউনিট।
  5. কমন ইউনিট ভাগ করুন: চুক্তিতে যেভাবে লেখা আছে (সমানভাবে বা অন্য কোনো নিয়মে) সেভাবে ভাগ করুন।
  6. প্রত্যেকের বিল: (নিজের ইউনিট + কমন ইউনিটের ভাগ) × গড় রেট।

একটি পূর্ণ উদাহরণ

ধরা যাক (উদাহরণ), একটি বাড়িতে দুটি ফ্ল্যাট — ফ্ল্যাট ‘ক’ ও ফ্ল্যাট ‘খ’। মূল মিটারে এ মাসে মোট ৬০০ ইউনিট খরচ হয়েছে এবং চার্জ ও ভ্যাটসহ মোট বিল এসেছে ৪,৮০০ টাকা। তাহলে গড় রেট = ৪,৮০০ ÷ ৬০০ = ৮ টাকা প্রতি ইউনিট।

সাব-মিটারে ‘ক’ ব্যবহার করেছে ২৬০ ইউনিট, ‘খ’ ব্যবহার করেছে ২২০ ইউনিট। মোট ৪৮০ ইউনিট। কমন ইউনিট = ৬০০ − ৪৮০ = ১২০ ইউনিট, যা চুক্তি অনুযায়ী দুই ফ্ল্যাটে সমানভাবে ৬০ ইউনিট করে ভাগ হবে।

ফ্ল্যাটনিজস্ব ইউনিটকমন ইউনিটের ভাগমোট ইউনিটবিল (৮ টাকা × ইউনিট)
ক২৬০৬০৩২০২,৫৬০ টাকা
খ২২০৬০২৮০২,২৪০ টাকা
মোট৪৮০১২০৬০০৪,৮০০ টাকা

দেখুন, দুই ফ্ল্যাটের বিলের যোগফল ঠিক মূল বিলের সমান। এই মিলটাই প্রমাণ করে হিসাব সঠিক হয়েছে।

প্রিপেইড মিটার হলে কী করবেন

মূল মিটার প্রিপেইড হলে মাসে যত টাকা রিচার্জ করেছেন এবং রিচার্জের বিপরীতে কত ইউনিট পাওয়া গেছে, তার হিসাব রাখুন। একইভাবে মোট টাকা ÷ মোট ইউনিট দিয়ে গড় রেট বের করে বাকি পদ্ধতি অনুসরণ করুন। রিচার্জের রসিদ বা এসএমএস সংরক্ষণ করুন।

বিরোধ এড়ানোর কিছু পরামর্শ

  • ভাড়াটিয়া ওঠার দিন সাব-মিটারের শুরুর রিডিং চুক্তিতে লিখে দুই পক্ষ স্বাক্ষর করুন।
  • কমন বিল কীভাবে ভাগ হবে তা আগেই চুক্তিতে ঠিক করুন।
  • প্রতি মাসে মিটারের ছবি ও হিসাবের সারাংশ ভাড়াটিয়াকে দিন।
  • সাব-মিটার নষ্ট বা সন্দেহজনক মনে হলে দ্রুত পরীক্ষা করান।

শেষ কথা

স্বচ্ছ হিসাব দেখালে ভাড়াটিয়ারা বিদ্যুৎ বিল নিয়ে খুব কমই আপত্তি করেন। প্রতি মাসে হাতে হাতে এই অঙ্ক কষা ক্লান্তিকর মনে হলে বাড়িওয়ালা ERP-এর মতো অ্যাপে রিডিং ও বিল লিপিবদ্ধ রাখতে পারেন, যাতে প্রতিটি ভাড়াটিয়ার ইউটিলিটি বিল ভাড়ার সঙ্গে একসঙ্গে হিসাব ও রেকর্ড করা যায়।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

সাব-মিটারের বিলে কোন রেট ধরা উচিত?

সবচেয়ে ন্যায্য উপায় হলো মূল বিলের মোট টাকাকে মূল মিটারের মোট ইউনিট দিয়ে ভাগ করে গড় রেট বের করা, যাতে সব ভাড়াটিয়ার বিলের যোগফল মূল বিলের সমান হয়।

সিঁড়ি ও পানির পাম্পের বিদ্যুৎ বিল কে দেবে?

এটি চুক্তির ওপর নির্ভর করে। প্রচলিত উপায় হলো মূল মিটার ও সাব-মিটারগুলোর পার্থক্য থেকে কমন ইউনিট বের করে ভাড়াটিয়াদের মধ্যে চুক্তিতে লেখা নিয়মে ভাগ করা, অথবা সার্ভিস চার্জের মধ্যে ধরা।

ভাড়াটিয়া রিডিং নিয়ে আপত্তি করলে কী করব?

প্রতি মাসের মিটার রিডিংয়ের ছবি ও হিসাবের সারাংশ দেখান। প্রয়োজনে দুই পক্ষ একসঙ্গে রিডিং নিন এবং সাব-মিটারটি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না পরীক্ষা করান।