মার্কেট বা শপিং কমপ্লেক্সে মাসের শুরুতে সবচেয়ে বেশি তর্ক হয় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে। একজন দোকানদার বলেন “আমি তো শুধু দুটো লাইট আর একটা ফ্যান চালাই, এত বিল কেন?”, আরেকজনের এসি সারাদিন চলে কিন্তু বিল মনে হয় কম। মূল মিটার একটি বা কয়েকটি, অথচ দোকান পঞ্চাশটি — এই অবস্থায় মার্কেটে দোকানভিত্তিক বিদ্যুৎ বিল ন্যায্যভাবে ভাগ করা না গেলে মালিকের লোকসান, দোকানদারের অসন্তোষ এবং কখনো কখনো বড় বিরোধ তৈরি হয়।
এই গাইডে আমরা দেখব — মার্কেটে বিদ্যুৎ সংযোগের সাধারণ ধরন, প্রতিটি দোকানে আলাদা মিটার বনাম সাব-মিটার, সাব-মিটার থেকে বিল হিসাবের ধাপ, প্রতি ইউনিট দর কীভাবে ঠিক করবেন, কমন এরিয়া (সিঁড়ি, করিডোর, লিফট, পাম্প) ও জেনারেটরের খরচ কীভাবে ভাগ করবেন, রিডিং নেওয়ার পদ্ধতি, বিরোধ এড়ানোর নিয়ম এবং সাধারণ ভুল। বাসাবাড়ির সাব-মিটার হিসাবের মূল পদ্ধতি জানতে পড়ুন সাব-মিটারের বিদ্যুৎ বিল হিসাব।
মার্কেটে বিদ্যুৎ সংযোগের সাধারণ ধরন
বাংলাদেশে মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবনে বিদ্যুৎ বিতরণ করে এলাকাভেদে ডেসকো (DESCO), ডিপিডিসি (DPDC), পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, নেসকো বা অন্যান্য বিতরণ সংস্থা। মার্কেটে সংযোগ সাধারণত তিন রকম হয়:
| ধরন | কীভাবে কাজ করে | সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|---|---|
| প্রতিটি দোকানে বিতরণ সংস্থার আলাদা মিটার | দোকানদার সরাসরি সংস্থাকে বিল দেন (পোস্টপেইড বা প্রিপেইড) | মালিকের হিসাবের ঝামেলা নেই, বিরোধ কম | সংযোগ নেওয়ার খরচ ও প্রক্রিয়া, প্রতিটি দোকানে আলাদা আবেদন |
| মূল মিটার + প্রতিটি দোকানে সাব-মিটার | মালিক সংস্থাকে মোট বিল দেন, দোকানদারদের থেকে সাব-মিটার অনুযায়ী আদায় করেন | একটি সংযোগ, নিয়ন্ত্রণ মালিকের হাতে | হিসাব, রিডিং ও আদায়ের দায়িত্ব মালিকের; বিরোধের ঝুঁকি |
| মূল মিটার, কোনো সাব-মিটার নেই | নির্দিষ্ট অঙ্ক বা লোড অনুমান করে ভাগ | শুরুতে সহজ | অন্যায্য, বিরোধপ্রবণ, মালিকের লোকসানের ঝুঁকি বেশি |
তৃতীয় পদ্ধতিটি থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসা উচিত। বড় মার্কেটে প্রথম পদ্ধতি সবচেয়ে ঝামেলামুক্ত, তবে যেখানে মূল সংযোগ একটি, সেখানে সাব-মিটারই বাস্তব সমাধান।
সাব-মিটার কী এবং কেন দরকার
সাব-মিটার (Sub-meter) হলো মূল মিটারের পরে বসানো একটি ছোট মিটার, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট দোকান বা অংশের বিদ্যুৎ খরচ মাপে। বিতরণ সংস্থা এটি দেখে বিল করে না — এটি মালিক ও দোকানদারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ হিসাবের জন্য। বিস্তারিত সংজ্ঞা পাবেন সাব-মিটার কী পাতায়।
সাব-মিটার বসানোর সময় খেয়াল রাখুন
- মানসম্মত মিটার: নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের ডিজিটাল মিটার, যার রিডিং সহজে পড়া যায়।
- সঠিক লোড অনুযায়ী: এসি বা ভারী যন্ত্র চালানো দোকানে সঠিক ক্ষমতার মিটার ও তার; প্রয়োজনে থ্রি-ফেজ।
- সিলযুক্ত ও দৃশ্যমান: মিটার এমন জায়গায় রাখুন যেখানে মালিক ও দোকানদার দুজনেই রিডিং দেখতে পারেন, আর কারসাজি ঠেকাতে সিল দিন।
- যোগ্য ইলেকট্রিশিয়ান: ভুল ওয়্যারিংয়ে এক দোকানের লাইন আরেক দোকানের মিটারে চলে যেতে পারে, যা বিরোধ ও অগ্নিঝুঁকি দুটোই বাড়ায়।
- মিটার নম্বর রেকর্ড: প্রতিটি সাব-মিটারের সিরিয়াল নম্বর কোন দোকানের, তা তালিকা করে রাখুন।
দোকানের বিদ্যুৎ বিল হিসাবের ধাপ
সাব-মিটার থাকলে প্রতি মাসের হিসাব মোটামুটি এভাবে হয়:
- মূল মিটারের বিল সংগ্রহ: মোট ইউনিট ও মোট টাকা (ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ইত্যাদি সহ) দেখুন।
- প্রতিটি সাব-মিটারের রিডিং: একই দিনে সব দোকানের বর্তমান রিডিং নিন।
- ব্যবহৃত ইউনিট: বর্তমান রিডিং − আগের মাসের রিডিং।
- প্রতি ইউনিট দর নির্ধারণ: নিচে আলোচনা করা পদ্ধতির যেকোনো একটি।
- দোকানের বিল: ব্যবহৃত ইউনিট × প্রতি ইউনিট দর (+ কমন এরিয়ার অংশ, যদি চুক্তিতে থাকে)।
- বিল জারি ও আদায়: ভাড়ার ইনভয়েসের সাথে বা আলাদা, তবে রিডিংসহ।
প্রতি ইউনিট দর কীভাবে ঠিক করবেন
এটিই সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন। বিতরণ সংস্থার বাণিজ্যিক বিলে শুধু ইউনিটের দামই নয়, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট ইত্যাদিও থাকতে পারে, আর ট্যারিফ সময়ে সময়ে বদলায়। তাই সাধারণত তিনটি পদ্ধতির একটি ব্যবহৃত হয়:
পদ্ধতি ১: গড় দর (সবচেয়ে প্রচলিত ও স্বচ্ছ)
মূল বিলের মোট টাকাকে মোট ইউনিট দিয়ে ভাগ করে প্রতি ইউনিটের গড় দর বের করা হয়। এতে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট সব খরচ ন্যায্যভাবে ইউনিট অনুপাতে ভাগ হয়ে যায়, এবং মালিক লাভ বা লোকসান করেন না।
পদ্ধতি ২: চুক্তিতে নির্দিষ্ট দর
চুক্তিতে লিখে দেওয়া হয় প্রতি ইউনিট একটি নির্দিষ্ট দর, যা সরকারি ট্যারিফ বদলালে সমন্বয় হবে। এটি সহজ, তবে দর যৌক্তিক ও স্বচ্ছ হতে হবে — অতিরিক্ত দর নিয়ে বিদ্যুৎ বিলকে লাভের উৎস বানালে বিরোধ ও অভিযোগের ঝুঁকি থাকে।
পদ্ধতি ৩: গড় দর + কমন এরিয়া আলাদা
দোকানের নিজস্ব ইউনিটের জন্য গড় দর, আর সিঁড়ি-করিডোর-লিফট-পাম্পের বিদ্যুৎ খরচ আলাদাভাবে সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ। বড় মার্কেটে এটিই সবচেয়ে ন্যায্য পদ্ধতি।
একটি পূর্ণ উদাহরণ
ধরা যাক (উদাহরণ), একটি ছোট মার্কেটে ৫টি দোকান এবং একটি মূল বাণিজ্যিক মিটার। এ মাসে মূল মিটারের বিল এসেছে মোট ২,০০০ ইউনিট, মোট ২৬,০০০ টাকা (সব চার্জ সহ — অঙ্কগুলো কাল্পনিক)।
- গড় দর: ২৬,০০০ ÷ ২,০০০ = ১৩ টাকা প্রতি ইউনিট
| দোকান | আগের রিডিং | বর্তমান রিডিং | ব্যবহৃত ইউনিট | বিল (× ১৩ টাকা) |
|---|---|---|---|---|
| দোকান-১ (কাপড়, এসি আছে) | ৪,২০০ | ৪,৭৫০ | ৫৫০ | ৭,১৫০ |
| দোকান-২ (মোবাইল) | ১,৮০০ | ২,০৫০ | ২৫০ | ৩,২৫০ |
| দোকান-৩ (ফার্মেসি, ফ্রিজ) | ৩,১০০ | ৩,৫২০ | ৪২০ | ৫,৪৬০ |
| দোকান-৪ (টেইলার্স) | ৯০০ | ১,০৮০ | ১৮০ | ২,৩৪০ |
| দোকান-৫ (রেস্টুরেন্ট) | ৬,৫০০ | ৬,৮৫০ | ৩৫০ | ৪,৫৫০ |
| দোকানগুলোর মোট | ১,৭৫০ | ২২,৭৫০ |
এখন দেখুন, মূল মিটারে ২,০০০ ইউনিট, কিন্তু দোকানগুলোর মোট ১,৭৫০ ইউনিট। বাকি ২,০০০ − ১,৭৫০ = ২৫০ ইউনিট হলো কমন এরিয়ার (সিঁড়ি ও করিডোরের আলো, পানির পাম্প, নিরাপত্তা ক্যামেরা) খরচ এবং তারে কিছু লস। এর টাকা: ২৫০ × ১৩ = ৩,২৫০ টাকা।
এই ৩,২৫০ টাকা কে দেবে? দুটি উপায়:
- সার্ভিস চার্জে অন্তর্ভুক্ত: যদি মাসিক সার্ভিস চার্জে কমন এরিয়ার বিদ্যুৎ ধরা থাকে, তাহলে মালিক সেখান থেকে বহন করবেন।
- সমান ভাগ বা অনুপাতে ভাগ: চুক্তিতে লেখা থাকলে ৫ দোকানে সমান ভাগ (৩,২৫০ ÷ ৫ = ৬৫০ টাকা করে) অথবা দোকানের বর্গফুট অনুপাতে ভাগ।
যে পদ্ধতিই নিন, তা চুক্তিতে ও মার্কেটের নিয়মাবলিতে লিখে রাখুন এবং বিলে আলাদা লাইনে দেখান। সার্ভিস চার্জের হিসাব নিয়ে বিস্তারিত পাবেন শপিং মলের সার্ভিস চার্জ গাইডে।
সতর্কতা: কমন এরিয়ার ইউনিট যদি হঠাৎ অনেক বেড়ে যায় (যেমন মোট ইউনিটের বড় অংশ), তাহলে কোথাও অবৈধ সংযোগ, নষ্ট মিটার বা লিকেজ আছে কি না দ্রুত একজন ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করান। এটি শুধু টাকার ক্ষতি নয়, অগ্নিঝুঁকিরও লক্ষণ হতে পারে।
জেনারেটর বা আইপিএস খরচ ভাগ
লোডশেডিংয়ের সময় অনেক মার্কেটে জেনারেটর চলে। জেনারেটরের খরচ (ডিজেল, রক্ষণাবেক্ষণ, অপারেটরের বেতন) বিদ্যুৎ বিলের বাইরে, তাই আলাদা নিয়ম দরকার:
- নির্দিষ্ট মাসিক চার্জ: প্রতিটি দোকান থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক, দোকানের সংযুক্ত লোড (যেমন কয়টি লাইট-ফ্যান, এসি সংযুক্ত কি না) অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
- প্রকৃত খরচ ভাগ: মাসে মোট জেনারেটর খরচ হিসাব করে সংযুক্ত দোকানগুলোর মধ্যে লোড বা বর্গফুট অনুপাতে ভাগ।
- আলাদা জেনারেটর সাব-মিটার: বড় মার্কেটে জেনারেটর লাইনে আলাদা মিটার বসিয়ে ইউনিট অনুযায়ী বিল।
ধরা যাক (উদাহরণ), এক মাসে জেনারেটরের মোট খরচ ১৮,০০০ টাকা (ডিজেল ১২,০০০ + অপারেটর ৪,০০০ + রক্ষণাবেক্ষণ ২,০০০)। ৩০টি দোকান সংযুক্ত, তার মধ্যে ১০টিতে এসি সংযুক্ত, যাদের জন্য দ্বিগুণ অংশ ধরা হয়েছে। তাহলে মোট অংশ = ২০ × ১ + ১০ × ২ = ৪০ অংশ। প্রতি অংশ = ১৮,০০০ ÷ ৪০ = ৪৫০ টাকা। সাধারণ দোকান দেবে ৪৫০ টাকা, এসিযুক্ত দোকান দেবে ৯০০ টাকা। মোট: ২০ × ৪৫০ + ১০ × ৯০০ = ৯,০০০ + ৯,০০০ = ১৮,০০০ টাকা।
রিডিং নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
অধিকাংশ বিরোধের উৎস রিডিং নিয়ে সন্দেহ। এগুলো মানলে সন্দেহ অনেক কমে:
- প্রতি মাসে একই তারিখে সব দোকানের রিডিং নিন, সম্ভব হলে মূল মিটারের বিলিং তারিখের কাছাকাছি।
- মিটারের ছবি তুলুন — মোবাইলে তারিখসহ ছবি পরে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
- দোকানদারকে সাথে রাখুন বা রিডিং লিখে তার স্বাক্ষর নিন; অন্তত বার্তায় রিডিং জানিয়ে দিন।
- একই ব্যক্তি রিডিং নেবেন — কেয়ারটেকার বা মার্কেট অফিসের নির্দিষ্ট কর্মী।
- রিডিং খাতা বা সফটওয়্যারে সাথে সাথে তুলুন, কাগজের টুকরোয় লিখে পরে নয়।
বিলের ফরম্যাট: দোকানদারকে কী দেখাবেন
স্বচ্ছ বিলই বিরোধের সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক। দোকানদারের বিদ্যুৎ বিলে থাকা উচিত:
- দোকান নম্বর ও দোকানদারের নাম
- বিলের মাস ও রিডিংয়ের তারিখ
- আগের রিডিং, বর্তমান রিডিং, ব্যবহৃত ইউনিট
- প্রতি ইউনিট দর এবং কীভাবে নির্ধারিত (যেমন “মূল বিলের গড় দর”)
- কমন এরিয়া বা জেনারেটরের অংশ (যদি থাকে) আলাদা লাইনে
- মোট টাকা ও পরিশোধের শেষ তারিখ
চাইলে মূল মিটারের বিলের কপি মার্কেট অফিসের নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দিতে পারেন। এতে সবাই দেখতে পান গড় দর কোথা থেকে এলো।
প্রিপেইড মিটার: একটি বিকল্প
অনেক এলাকায় বিতরণ সংস্থাগুলো প্রিপেইড মিটার চালু করেছে। প্রতিটি দোকানে যদি সংস্থার প্রিপেইড মিটার থাকে, তাহলে দোকানদার নিজেই রিচার্জ করেন এবং মালিকের বিল আদায়ের দায়িত্ব থাকে না। নতুন সংযোগ বা মিটার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ও খরচ সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার অফিস থেকে জেনে নিন। বাসাবাড়ির প্রেক্ষাপটে এর সুবিধা-অসুবিধা আলোচনা করা আছে ভাড়াটিয়ার জন্য প্রিপেইড মিটার লেখায়।
দোকানদার বদলের সময় মিটারের হিসাব
মাসের মাঝখানে কোনো দোকানদার চলে গেলে বা নতুন কেউ এলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গোলমাল খুব সাধারণ। নিয়মটা সহজ: হস্তান্তরের দিনই মিটার রিডিং নিন এবং উভয় পক্ষের স্বাক্ষর বা ছবিসহ রেকর্ড রাখুন।
ধরা যাক (উদাহরণ), দোকান-২-এর পুরোনো দোকানদার ১৫ তারিখে চলে গেলেন। মাসের শুরুর রিডিং ছিল ২,০৫০, হস্তান্তরের দিনের রিডিং ২,১৮০, আর মাস শেষের রিডিং ২,৩১০। তাহলে:
- পুরোনো দোকানদারের ইউনিট: ২,১৮০ − ২,০৫০ = ১৩০ ইউনিট
- নতুন দোকানদারের ইউনিট: ২,৩১০ − ২,১৮০ = ১৩০ ইউনিট
- গড় দর মাস শেষে মূল বিল থেকে বের হবে (ধরি ১৩ টাকা); পুরোনো দোকানদারের বিল ১৩০ × ১৩ = ১,৬৯০ টাকা
পুরোনো দোকানদারের মূল বিল তখনো আসেনি বলে অনেকে আগের মাসের গড় দর ধরে হিসাব করে জামানত থেকে সমন্বয় করেন। এই নিয়মটিও চুক্তিতে বা নিয়মাবলিতে লিখে রাখা ভালো, যাতে বিদায়ের সময় তর্ক না হয়।
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল সামলানো
মালিক যখন মূল মিটারের বিল নিজের পকেট থেকে সময়মতো পরিশোধ করেন, অথচ কয়েকজন দোকানদার বিল দেন না, তখন সেই বকেয়া দ্রুত বড় হয়ে যায়। কয়েকটি নিয়ম সাহায্য করে: বিদ্যুৎ বিলের শেষ তারিখ ভাড়ার তারিখের সাথে মিলিয়ে রাখুন, ইনভয়েসে বিদ্যুৎ বিল আলাদা লাইনে দেখান, আর বকেয়া তালিকায় ভাড়া ও বিদ্যুৎ আলাদা কলামে রাখুন। দোকান ভাড়ার বকেয়া আদায়ের ধাপগুলো বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য — দেখুন দোকান ভাড়া বকেয়া আদায়ের কৌশল।
চুক্তিতে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে যা লিখবেন
- দোকানের বিদ্যুৎ কোন মিটারে (সংস্থার আলাদা মিটার নাকি সাব-মিটার)
- প্রতি ইউনিট দর নির্ধারণের পদ্ধতি
- কমন এরিয়ার বিদ্যুৎ খরচ কীভাবে বহন হবে
- জেনারেটর সংযোগ ও তার চার্জ
- রিডিংয়ের তারিখ ও বিল পরিশোধের শেষ তারিখ
- বিল বকেয়া হলে কী পদক্ষেপ (আইনসম্মত, লিখিত নোটিশসহ)
- দোকানদার নিজে অতিরিক্ত লোড (যেমন নতুন এসি) যোগ করতে চাইলে অনুমতির নিয়ম
- দোকান হস্তান্তর ও ছাড়ার সময় মিটার রিডিং
বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও লোড ব্যবস্থাপনা
বিলের পাশাপাশি নিরাপত্তাও মালিকের দায়িত্ব। মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় কারণ হতে পারে অতিরিক্ত লোড ও নিম্নমানের ওয়্যারিং। তাই:
- দোকানদার অনুমতি ছাড়া বড় যন্ত্র (এসি, ওভেন, হিটার) যোগ করতে পারবেন না — এটি নিয়মে রাখুন।
- প্রতিটি দোকানে সঠিক ক্ষমতার সার্কিট ব্রেকার।
- বছরে অন্তত একবার যোগ্য ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে পুরো মার্কেটের ওয়্যারিং পরিদর্শন।
- ঝুলন্ত বা জোড়াতালির তার দেখামাত্র মেরামত।
বিস্তারিত পড়ুন মার্কেট ও শপিং মলের অগ্নি নিরাপত্তা গাইডে।
সাধারণ ভুল
- আন্দাজে নির্দিষ্ট অঙ্কে বিল — যে কম ব্যবহার করে সে অসন্তুষ্ট হয়, যে বেশি করে সে লাভবান হয়।
- একেক মাসে একেক তারিখে রিডিং — মাসভেদে ইউনিট অস্বাভাবিক ওঠানামা করে।
- কমন এরিয়ার খরচ হিসাবই না করা — মালিক নিজের অজান্তে প্রতি মাসে লোকসান গোনেন।
- বিদ্যুৎ বিলকে লাভের উৎস বানানো — অযৌক্তিক দর বিরোধ ও অভিযোগ ডেকে আনে।
- ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল এক অঙ্কে মিশিয়ে ফেলা — কোনটা বকেয়া বোঝা যায় না।
- নষ্ট সাব-মিটার মাসের পর মাস না বদলানো — ওই সময়ের বিল নিয়ে বিরোধ নিশ্চিত।
- বকেয়ার চাপে হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা — আগে লিখিত নোটিশ ও চুক্তির নিয়ম মেনে চলুন, প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ নিন।
মাসিক কাজের চেকলিস্ট
- মূল মিটারের বিল হাতে পাওয়া মাত্র মোট ইউনিট ও টাকা লিখে রাখুন
- নির্দিষ্ট তারিখে সব সাব-মিটারের রিডিং ও ছবি
- গড় দর ও প্রতিটি দোকানের বিল হিসাব
- কমন এরিয়ার ইউনিট যাচাই — অস্বাভাবিক হলে তদন্ত
- জেনারেটরের মাসিক খরচ হিসাব ও ভাগ
- বিল জারি (রিডিংসহ) ও পরিশোধের শেষ তারিখ জানানো
- মূল বিল নির্ধারিত সময়ে বিতরণ সংস্থাকে পরিশোধ
- বকেয়া বিলের তালিকা ও রিমাইন্ডার
শেষ কথা
মার্কেটে দোকানভিত্তিক বিদ্যুৎ বিল ন্যায্য করার মূলমন্ত্র তিনটি: প্রতিটি দোকানে নির্ভরযোগ্য সাব-মিটার, স্বচ্ছ ও চুক্তিতে লেখা দর নির্ধারণের পদ্ধতি, আর প্রতি মাসে নিয়মিত রিডিং ও বিস্তারিত বিল। এগুলো ঠিক থাকলে দোকানদাররা বিল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও উত্তর দেওয়া সহজ হয়, এবং মালিকও কমন এরিয়ার খরচ নিয়ে নিজের অজান্তে লোকসান গোনেন না।
দোকানের সংখ্যা বেশি হলে প্রতি মাসে রিডিং তুলে হিসাব করা, বিল বানানো ও আদায় মেলানো সময়সাপেক্ষ। বাড়িওয়ালা ERP-তে সাব-মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ বিল হিসাব করে ভাড়ার ইনভয়েসের সাথে যুক্ত করা যায় এবং বকেয়া তালিকা ও রসিদ একসাথে দেখা যায় — আপনার মার্কেটের জন্য উপযোগী কি না যাচাই করে দেখতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
মার্কেটের দোকানে বিদ্যুৎ বিল কীভাবে ভাগ করা উচিত?
সবচেয়ে ন্যায্য উপায় হলো প্রতিটি দোকানে সাব-মিটার বসিয়ে ব্যবহৃত ইউনিট অনুযায়ী বিল করা। প্রতি ইউনিট দর সাধারণত মূল মিটারের মোট বিলকে মোট ইউনিট দিয়ে ভাগ করে বের করা হয়।
সাব-মিটারের প্রতি ইউনিট দর কত ধরব?
স্বচ্ছ পদ্ধতি হলো মূল বিলের মোট টাকা ÷ মোট ইউনিট দিয়ে গড় দর বের করা, যাতে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাটসহ সব খরচ অনুপাতে ভাগ হয়। নির্দিষ্ট দর নিলে তা যৌক্তিক রাখুন এবং চুক্তিতে লিখুন।
সিঁড়ি, করিডোর ও পাম্পের বিদ্যুৎ খরচ কে দেবে?
মূল মিটারের ইউনিট থেকে দোকানগুলোর মোট ইউনিট বাদ দিলে কমন এরিয়ার খরচ পাওয়া যায়। এটি সার্ভিস চার্জে অন্তর্ভুক্ত রাখা বা দোকানগুলোর মধ্যে সমান বা বর্গফুট অনুপাতে ভাগ করা যায় — যেটাই হোক, চুক্তিতে লিখে রাখুন।
জেনারেটরের খরচ দোকানদারদের মধ্যে কীভাবে ভাগ করব?
মাসিক মোট খরচ (ডিজেল, অপারেটর, রক্ষণাবেক্ষণ) হিসাব করে সংযুক্ত লোড বা বর্গফুট অনুপাতে ভাগ করা যায়, অথবা জেনারেটর লাইনে আলাদা মিটার বসিয়ে ইউনিট অনুযায়ী বিল করা যায়।
দোকানদার সাব-মিটারের রিডিং নিয়ে সন্দেহ করলে কী করব?
প্রতি মাসে একই তারিখে রিডিং নিন, মিটারের ছবি রাখুন এবং সম্ভব হলে দোকানদারের উপস্থিতিতে রিডিং নিন। প্রয়োজনে যোগ্য ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে মিটার পরীক্ষা করান।
প্রতিটি দোকানে আলাদা সরকারি মিটার নেওয়া কি ভালো?
বিতরণ সংস্থার আলাদা মিটার থাকলে দোকানদার সরাসরি বিল দেন এবং মালিকের হিসাব ও বিরোধের ঝামেলা কমে। সংযোগের প্রক্রিয়া ও খরচ সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থা থেকে জেনে নিন।
বিদ্যুৎ বিল বকেয়া হলে কি সংযোগ কেটে দেওয়া যায়?
হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা বিরোধ ও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। আগে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লিখিত নোটিশ দিন এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।