অনেক বাড়িওয়ালা এখনো মুখের কথায় বা এক পাতার সাধারণ কাগজে বাসা ভাড়া দেন। সম্পর্ক ভালো থাকলে সমস্যা হয় না, কিন্তু ভাড়া বকেয়া পড়লে, বাসার ক্ষতি হলে বা হঠাৎ বাসা ছাড়ার প্রশ্ন উঠলে তখন বোঝা যায় লিখিত চুক্তির গুরুত্ব। একটি ভালো চুক্তিপত্র দুই পক্ষের প্রত্যাশা আগেই স্পষ্ট করে দেয়। এই গাইডে দেখে নিন চুক্তিপত্র কীভাবে লিখবেন এবং কোন শর্তগুলো কখনোই বাদ দেবেন না।

চুক্তিপত্রের মৌলিক কাঠামো

একটি সাধারণ বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রে নিচের অংশগুলো থাকা উচিত:

  1. শিরোনাম ও তারিখ: “বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র” এবং চুক্তি সম্পাদনের তারিখ ও স্থান।
  2. পক্ষদের পরিচয়: বাড়িওয়ালা (প্রথম পক্ষ) ও ভাড়াটিয়ার (দ্বিতীয় পক্ষ) নাম, পিতা/স্বামীর নাম, স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল নম্বর।
  3. সম্পত্তির বিবরণ: বাড়ির ঠিকানা, ফ্ল্যাট নম্বর, তলা, কক্ষ সংখ্যা এবং সঙ্গে দেওয়া আসবাব বা ফিটিংস।
  4. ভাড়া ও পরিশোধের নিয়ম: মাসিক ভাড়ার অঙ্ক (সংখ্যায় ও কথায়), কোন তারিখের মধ্যে দিতে হবে, কীভাবে দিতে হবে (নগদ, ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং)।
  5. মেয়াদ: চুক্তি কবে শুরু, কত দিনের জন্য, এবং নবায়নের নিয়ম।
  6. স্বাক্ষর ও সাক্ষী: দুই পক্ষের স্বাক্ষর এবং অন্তত দুজন সাক্ষীর নাম-ঠিকানা-স্বাক্ষর।

যে শর্তগুলো অবশ্যই রাখবেন

অগ্রিম ও জামানত

কত টাকা অগ্রিম নেওয়া হলো, সেটি কি ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় হবে নাকি বাসা ছাড়ার সময় ফেরত দেওয়া হবে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কাটা যাবে — সব স্পষ্ট লিখুন। অগ্রিমের পরিমাণ ঠিক করার আগে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর সর্বশেষ বিধান দেখে নিন।

ইউটিলিটি ও সার্ভিস চার্জ

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট, ময়লা, দারোয়ান, লিফট ও জেনারেটরের খরচ কে দেবেন এবং কীভাবে হিসাব হবে, তা লিখে রাখুন। সাব-মিটার থাকলে মিটার নম্বর ও শুরুর রিডিং চুক্তিতে উল্লেখ করুন।

নোটিশ পিরিয়ড

বাসা ছাড়তে চাইলে ভাড়াটিয়া কত দিন আগে জানাবেন, আর বাড়িওয়ালা বাসা খালি করতে চাইলে কত দিন আগে নোটিশ দেবেন — উভয়ের জন্য সময় নির্ধারণ করুন। নোটিশ লিখিত হতে হবে, এটিও শর্তে রাখুন।

ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ

  • বাসা শুধু আবাসিক কাজে ব্যবহার হবে কি না।
  • অনুমতি ছাড়া সাবলেট বা কাঠামোগত পরিবর্তন নিষেধ।
  • ছোটখাটো মেরামত (বাল্ব, কল) কে করবেন, বড় মেরামত (পাইপলাইন, ছাদ চুইয়ে পানি) কে করবেন।
  • পোষা প্রাণী, বাড়ির নিয়ম ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত।

এক নজরে চুক্তির চেকলিস্ট

বিষয়কী লিখবেন
ভাড়াঅঙ্ক, পরিশোধের শেষ তারিখ, পদ্ধতি
অগ্রিমপরিমাণ, সমন্বয় বা ফেরতের নিয়ম
মেয়াদশুরুর তারিখ, মেয়াদকাল, নবায়ন
ভাড়া বৃদ্ধিকখন ও কীভাবে জানানো হবে
বিলকোন বিল কে দেবেন, মিটার রিডিং
নোটিশউভয় পক্ষের নোটিশের সময়
হস্তান্তরবাসার অবস্থা ও জিনিসপত্রের তালিকা

স্ট্যাম্প, সাক্ষী ও কপি

সাধারণত চুক্তিপত্র নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লেখা হয়। কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে বা নিবন্ধন প্রয়োজন কি না, তা চুক্তির মেয়াদ ও প্রচলিত বিধানের ওপর নির্ভর করে — এ বিষয়ে স্থানীয় দলিল লেখক বা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন। চুক্তির অন্তত দুটি মূল কপি করুন, যাতে দুই পক্ষের কাছেই একটি করে থাকে। প্রতিটি পাতায় দুই পক্ষের অনুস্বাক্ষর রাখা ভালো অভ্যাস।

সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন

  • ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি না রাখা।
  • “আলোচনা সাপেক্ষে” জাতীয় অস্পষ্ট শব্দ দিয়ে জরুরি শর্ত লেখা।
  • বাসা হস্তান্তরের সময় অবস্থার বিবরণ বা ছবি না রাখা।
  • মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়ন না করে পুরোনো চুক্তিতেই চলতে থাকা।

শেষ কথা

একটি গোছানো চুক্তিপত্র লিখতে হয়তো এক ঘণ্টা সময় লাগে, কিন্তু এটি বছরের পর বছর বিরোধ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারে। নিজের পরিস্থিতির জন্য চুক্তির ভাষা চূড়ান্ত করার আগে প্রয়োজনে আইনজীবীর সাহায্য নিন। চুক্তির মেয়াদ, ভাড়ার অঙ্ক ও অগ্রিমের তথ্য বাড়িওয়ালা ERP-এ সংরক্ষণ করে রাখলে নবায়নের সময় বা হিসাব মেলানোর সময় সহজেই খুঁজে পাবেন।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র কি স্ট্যাম্পে করতে হয়?

সাধারণত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করা হয়। স্ট্যাম্পের মূল্য ও নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা চুক্তির মেয়াদ ও প্রচলিত বিধানের ওপর নির্ভর করে, তাই স্থানীয় দলিল লেখক বা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

চুক্তিপত্রে কয়জন সাক্ষী লাগে?

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অন্তত দুজন সাক্ষী রাখা হয়, যাঁদের নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর চুক্তিতে থাকে।

চুক্তির মেয়াদ কত দিনের হওয়া উচিত?

বাসা ভাড়ায় সাধারণত এক বছরের চুক্তি বেশি প্রচলিত, তবে দুই পক্ষ আলোচনা করে মেয়াদ ঠিক করতে পারেন। নবায়নের নিয়মও চুক্তিতে লিখে রাখুন।