বাসা দেখতে গিয়ে আমরা সাধারণত দেখি ঘর কয়টা, টাইলস কেমন, বারান্দা আছে কিনা। কিন্তু উঠে যাওয়ার পর যে সমস্যাগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগায় — সকালে পানি না থাকা, দেয়ালে ড্যাম্প, গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক হিসাব, কিংবা জামানত ফেরত নিয়ে বাড়িওয়ালার সাথে বিরোধ — সেগুলো প্রথম দেখায় চোখে পড়ে না। এজন্যই দরকার একটা বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে চেকলিস্ট, যা হাতে নিয়ে প্রতিটি বাসা একইভাবে যাচাই করবেন।
নিচের ২৫টি পয়েন্ট পাঁচ ভাগে সাজানো: এলাকা ও ভবন, বাসার ভেতরের অবস্থা, ইউটিলিটি (পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস), খরচ ও টাকা-পয়সা, আর চুক্তি ও কাগজপত্র। প্রতিটি পয়েন্টে কী দেখবেন ও কী জিজ্ঞেস করবেন, তা ব্যাখ্যা করা আছে। শেষে একটা নম্বর দেওয়ার পদ্ধতি আর উদাহরণ আছে, যাতে কয়েকটি বাসার মধ্যে তুলনা করা সহজ হয়। বাসা খোঁজার পুরো প্রক্রিয়া জানতে আগে পড়ে নিতে পারেন ঢাকায় বাসা খোঁজার পূর্ণাঙ্গ গাইড।
চেকলিস্ট ব্যবহারের নিয়ম
- প্রতিটি বাসা দেখতে যাওয়ার সময় এই তালিকা প্রিন্ট করে বা মোবাইলে নিয়ে যান।
- সম্ভব হলে দিনের আলোয় যান — সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। পানি ও আলো দুটোই ভালো বোঝা যায়।
- পরিবারের আরেকজনকে সাথে নিন; দুই জোড়া চোখ বেশি দেখে।
- প্রতিটি বাসার ছবি ও ছোট ভিডিও তুলুন, নাম দিয়ে রাখুন (যেমন “মিরপুর-১০, ৪র্থ তলা”)।
- বাড়িওয়ালার উত্তরগুলো সাথে সাথে লিখে ফেলুন।
ভাগ ১: এলাকা ও ভবন (পয়েন্ট ১–৫)
১. যাতায়াতের সময়
অফিস, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে প্রকৃত সময় কত লাগে — ব্যস্ত সময়ে। গুগল ম্যাপে দেখা দূরত্ব আর সকাল ৮টার যানজটে বাস্তব সময় আলাদা। কাছে মেট্রোরেল স্টেশন বা বাস রুট আছে কিনা দেখুন।
২. জলাবদ্ধতা ও রাস্তার অবস্থা
বর্ষায় গলিতে পানি জমে কিনা, রাস্তা কাঁচা নাকি পাকা, রিকশা ঢোকে কিনা। প্রতিবেশী বা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করুন — “গত বর্ষায় পানি উঠেছিল?”
৩. নিরাপত্তা ও দারোয়ান
ভবনে দারোয়ান আছে কিনা, মূল গেটে তালা, সিসিটিভি, রাতে গলির আলো। গেট কখন বন্ধ হয় এবং দেরিতে ফিরলে কী নিয়ম, জেনে নিন।
৪. লিফট, জেনারেটর ও পার্কিং
৫–৬ তলার উপরে থাকলে লিফট কার্যকর কিনা, লোডশেডিংয়ে জেনারেটর লিফট চালায় কিনা, জেনারেটরে বাসার কোন কোন লাইট-ফ্যান চলে। গাড়ি বা মোটরসাইকেল থাকলে পার্কিংয়ের জায়গা ও আলাদা ভাড়া।
৫. আশেপাশের পরিবেশ
পাশে কারখানা, ওয়ার্কশপ, বাসস্ট্যান্ড, কাঁচাবাজার বা নির্মাণাধীন ভবন থাকলে শব্দ, ধুলা ও গন্ধ হতে পারে। পাশের ভবন খুব কাছে হলে আলো-বাতাস আটকে যায়।
ভাগ ২: বাসার ভেতরের অবস্থা (পয়েন্ট ৬–১২)
৬. দেয়াল ও ছাদে ড্যাম্প, ফাটল
দেয়ালের নিচের অংশে লোনা, রং ফুলে ওঠা, কালচে ছোপ, ছাদে পানির দাগ — এগুলো ড্যাম্প বা লিকেজের লক্ষণ। টপ ফ্লোরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। সদ্য রং করা দেয়ালেও ড্যাম্প লুকানো থাকতে পারে — আলমারির পেছনের কোণ দেখুন।
৭. আলো ও বাতাস
দিনের বেলা লাইট না জ্বালিয়ে ঘরগুলো কতটা আলোকিত? জানালা খুললে বাতাস চলাচল হয় কি? আলো-বাতাসহীন বাসায় স্যাঁতসেঁতে ভাব ও বিদ্যুৎ খরচ দুটোই বেশি।
৮. বাথরুম
কমোড ফ্লাশ, বেসিন ও শাওয়ারের কল, ফ্লোর ড্রেন দিয়ে পানি দ্রুত নামে কিনা, এক্সহস্ট ফ্যান, গিজার আছে কিনা এবং কার্যকর কিনা। টাইলসের ফাঁকে কালো দাগ পুরোনো লিকেজের চিহ্ন হতে পারে।
৯. রান্নাঘর
চুলার জায়গা, সিঙ্কের ড্রেন, এক্সহস্ট বা জানালা, কেবিনেট, গ্যাস লাইনের পাইপ কোথা দিয়ে গেছে। রান্নাঘরে বাতাস চলাচল না থাকলে গরম ও গ্যাস জমার ঝুঁকি।
১০. দরজা, জানালা ও গ্রিল
প্রতিটি দরজার তালা ও ছিটকিনি, জানালার কাচ, মশারির নেট, বারান্দার গ্রিলের উচ্চতা ও ফাঁক — বিশেষ করে ছোট শিশু থাকলে।
১১. বৈদ্যুতিক সুইচ ও সকেট
প্রতিটি সুইচ টিপে দেখুন, সকেটে চার্জার লাগিয়ে পরীক্ষা করুন। এসি লাগাতে চাইলে এসি পয়েন্ট ও আলাদা লাইন আছে কিনা। পোড়া দাগওয়ালা সকেট বিপজ্জনক ওয়্যারিংয়ের লক্ষণ।
১২. মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট
ঘরের ভেতরে আপনার মোবাইল অপারেটরের সিগন্যাল, আর এলাকায় কোন কোন ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেয়। ঘরে বসে অফিস করলে এটা মৌলিক প্রয়োজন।
ভাগ ৩: পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস (পয়েন্ট ১৩–১৭)
১৩. পানির সরবরাহ ও সময়
সব কল একসাথে খুলে চাপ দেখুন। জিজ্ঞেস করুন: দিনে কখন পানি থাকে, ওয়াসার লাইন নাকি ডিপ টিউবওয়েল, ছাদের ট্যাংক কত বড়, কতদিন পরপর পরিষ্কার হয়। সম্ভব হলে অন্য ভাড়াটিয়াকে জিজ্ঞেস করুন — তাঁদের উত্তর সবচেয়ে বাস্তব।
১৪. পানির মান
এক গ্লাস পানি নিয়ে রং ও গন্ধ দেখুন। আয়রন বা লালচে পানি হলে ফিল্টারের বাড়তি খরচ ধরুন।
১৫. বিদ্যুৎ মিটারের ধরন
বাসার নিজস্ব প্রিপেইড মিটার (DESCO, DPDC বা সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির) থাকলে আপনি নিজে রিচার্জ করবেন, হিসাব স্বচ্ছ। সাব-মিটার হলে বাড়িওয়ালা রিডিং অনুযায়ী বিল করবেন — তখন জিজ্ঞেস করুন প্রতি ইউনিট কত টাকা ধরা হয় এবং কীভাবে হিসাব হয়। ওঠার দিনের রিডিং লিখে রাখার কথা মনে রাখুন।
১৬. গ্যাস সংযোগ
তিতাসের লাইন নাকি এলপিজি সিলিন্ডার? লাইনে থাকলে বিল কীভাবে ভাগ হয় (ভাড়ার সাথে নির্দিষ্ট অঙ্ক নাকি আলাদা)। চুলা জ্বালিয়ে চাপ দেখুন — অনেক এলাকায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ে চাপ কম থাকে। গ্যাসের গন্ধ পেলে সতর্ক হোন।
১৭. ময়লা সংগ্রহ ও অন্যান্য সেবা
বাসা থেকে ময়লা কে নেয়, মাসে কত টাকা, কোথায় রাখতে হয়। ডিশ বা কেবল লাইনের ব্যবস্থা।
ভাগ ৪: খরচ ও টাকা-পয়সা (পয়েন্ট ১৮–২১)
১৮. ভাড়ায় কী কী অন্তর্ভুক্ত
“ভাড়া ২০ হাজার” বললে জিজ্ঞেস করুন — সার্ভিস চার্জ, পানি, গ্যাস, দারোয়ান, লিফট, জেনারেটর কি এর মধ্যে, নাকি আলাদা? সবকিছু যোগ করে মোট মাসিক খরচ লিখুন।
১৯. অগ্রিম বা জামানতের পরিমাণ ও শর্ত
কত মাসের অগ্রিম, এটা জামানত (শেষে ফেরতযোগ্য) নাকি অগ্রিম ভাড়া (মাসে মাসে সমন্বয়)? ফেরত কীভাবে, কত দিনে? বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এ অগ্রিম সংক্রান্ত বিধান আছে; বড় অঙ্ক চাওয়া হলে বিষয়টি জেনে নিন।
২০. ভাড়া বৃদ্ধির নিয়ম
ভাড়া সাধারণত কত দিন পরপর, কতটা বাড়ানো হয়? প্রথম বছর না বাড়ানোর আশ্বাস পেলে চুক্তিতে লিখিয়ে নিন।
২১. পরিশোধের পদ্ধতি ও রসিদ
ভাড়া কত তারিখের মধ্যে, নগদ নাকি বিকাশ/নগদ/ব্যাংকে? প্রতি মাসে লিখিত রসিদ দেন কিনা? মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিলে ট্রানজ্যাকশন আইডি আর রসিদ দুটোই রাখুন। নিয়মিত রসিদ দেওয়া বাড়িওয়ালা সাধারণত হিসাবে স্বচ্ছ হন।
ভাগ ৫: চুক্তি, কাগজপত্র ও নিয়ম (পয়েন্ট ২২–২৫)
২২. লিখিত চুক্তি
চুক্তিতে ভাড়া, অগ্রিম, মেয়াদ, নোটিশের সময়, ভাড়া বৃদ্ধি, মেরামতের দায়, বাসা ছাড়ার শর্ত থাকবে। দুই কপি, দুই পক্ষের স্বাক্ষর, সম্ভব হলে সাক্ষী। চুক্তির একটি নমুনা দেখে নিতে পারেন বাসা ভাড়ার চুক্তিপত্রের নমুনা পাতায়।
২৩. মালিকানা যাচাই
যিনি ভাড়া দিচ্ছেন তিনি প্রকৃত মালিক বা তাঁর বৈধ প্রতিনিধি কিনা নিশ্চিত হোন — দারোয়ান, প্রতিবেশী বা অন্য ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে। প্রয়োজনে হোল্ডিং ট্যাক্স বা বিদ্যুৎ বিলের নাম দেখতে চাইতে পারেন।
২৪. ভবনের নিয়ম
অতিথি রাতে থাকতে পারবেন কিনা, ছাদ ব্যবহার, পোষা প্রাণী, কাপড় শুকানোর জায়গা, গেট বন্ধের সময়, শব্দ সংক্রান্ত নিয়ম। নিয়ম যত আগে জানবেন, তত কম ভুল বোঝাবুঝি।
২৫. পুলিশের ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম ও নিজের কাগজ
ঢাকায় ভাড়াটিয়ার তথ্য থানায় জমা দিতে হয়; বাড়িওয়ালা ফরম দেবেন। আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও পরিবারের তথ্য প্রস্তুত রাখুন। ফরম সম্পর্কে বিস্তারিত পাবেন ডিএমপি ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম গাইড-এ।
পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়তি পয়েন্ট
২৫টি পয়েন্ট সবার জন্য। তবে আপনার পরিবারের ধরন বা বাসার ধরন অনুযায়ী আরও কয়েকটা বিষয় দেখা দরকার।
ছোট শিশু থাকলে
- বারান্দা ও জানালার গ্রিলের ফাঁক এত বড় কিনা যে শিশু মাথা বা হাত গলাতে পারে
- সিঁড়িতে রেলিং আছে কিনা, ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকে কিনা
- সকেটগুলো খুব নিচে কিনা
- কাছে স্কুল, ডাক্তার ও খেলার জায়গা
বয়স্ক সদস্য থাকলে
- লিফট আছে কিনা, না থাকলে নিচের দিকের তলা
- বাথরুমের মেঝে পিচ্ছিল কিনা, কমোড নাকি প্যান
- হাসপাতাল বা ক্লিনিকের দূরত্ব, অ্যাম্বুলেন্স গলিতে ঢুকতে পারে কিনা
টপ ফ্লোর বা নিচতলা হলে
- টপ ফ্লোর: গ্রীষ্মে ছাদ গরম হয়ে ঘর বেশি গরম থাকে, বর্ষায় লিকেজের ঝুঁকি। ছাদে তাপরোধী ব্যবস্থা আছে কিনা, আর ছাদে ট্যাংক বা মোবাইল টাওয়ার থাকলে শব্দ-কম্পন আছে কিনা দেখুন।
- নিচতলা: স্যাঁতসেঁতে ভাব, মশা, রাস্তার শব্দ ও নিরাপত্তা (জানালার গ্রিল) বিশেষভাবে দেখুন। বর্ষায় পানি ঢোকে কিনা জিজ্ঞেস করুন।
ফার্নিশড বা সেমি-ফার্নিশড বাসা হলে
- আসবাব ও যন্ত্রপাতির তালিকা (খাট, আলমারি, ফ্রিজ, এসি, গিজার) লিখিত নিন, প্রতিটির অবস্থাসহ
- যন্ত্র নষ্ট হলে মেরামতের দায় কার, চুক্তিতে লিখুন
- বাসা ছাড়ার সময় এই তালিকা ধরে মিলিয়ে দেওয়া হবে — তাই ওঠার দিন ছবি রাখুন
লাল পতাকা: যেসব লক্ষণ দেখলে দ্বিতীয়বার ভাবুন
কিছু লক্ষণ আছে যা দেখলে বাসাটা যত সুন্দরই হোক, থেমে ভাবা উচিত:
- বাড়িওয়ালা বা প্রতিনিধি বাসা দেখানোর আগেই “বুকিং মানি” চাইছেন
- লিখিত চুক্তি বা রসিদ দিতে অনীহা
- ভাড়া আশেপাশের তুলনায় অস্বাভাবিক কম, কারণ ব্যাখ্যা করতে পারছেন না
- আগের ভাড়াটিয়া খুব অল্প সময়ে চলে গেছেন, আর কারণ নিয়ে অস্পষ্ট উত্তর
- পানি বা গ্যাসের প্রশ্নে এড়িয়ে যাওয়া উত্তর — “চলে, সমস্যা নেই”
- দেয়ালে সদ্য রং কিন্তু শুধু নির্দিষ্ট অংশে
- প্রকৃত মালিক কে, তা নিয়ে গোলমেলে তথ্য
এসব লক্ষণ থাকলেই যে প্রতারণা, তা নয় — কিন্তু বাড়তি যাচাই দরকার। ভুয়া বিজ্ঞাপন ও ভাড়া-প্রতারণা চেনার বিস্তারিত পাবেন ভাড়া-প্রতারণা প্রতিরোধ গাইড-এ।
এক নজরে ২৫ পয়েন্টের চেকলিস্ট
| # | বিষয় | # | বিষয় |
|---|---|---|---|
| ১ | যাতায়াতের সময় | ১৪ | পানির মান |
| ২ | জলাবদ্ধতা ও রাস্তা | ১৫ | বিদ্যুৎ মিটারের ধরন |
| ৩ | নিরাপত্তা ও দারোয়ান | ১৬ | গ্যাস সংযোগ ও চাপ |
| ৪ | লিফট, জেনারেটর, পার্কিং | ১৭ | ময়লা ও অন্যান্য সেবা |
| ৫ | আশেপাশের পরিবেশ | ১৮ | ভাড়ায় কী অন্তর্ভুক্ত |
| ৬ | ড্যাম্প ও ফাটল | ১৯ | অগ্রিম/জামানতের শর্ত |
| ৭ | আলো ও বাতাস | ২০ | ভাড়া বৃদ্ধির নিয়ম |
| ৮ | বাথরুম | ২১ | পরিশোধ পদ্ধতি ও রসিদ |
| ৯ | রান্নাঘর | ২২ | লিখিত চুক্তি |
| ১০ | দরজা, জানালা, গ্রিল | ২৩ | মালিকানা যাচাই |
| ১১ | সুইচ ও সকেট | ২৪ | ভবনের নিয়ম |
| ১২ | নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট | ২৫ | ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম ও কাগজ |
| ১৩ | পানির সরবরাহ ও সময় |
উদাহরণ: নম্বর দিয়ে দুটি বাসার তুলনা
কয়েকটা বাসা দেখার পর সব গুলিয়ে যায়। সহজ সমাধান: প্রতিটি পয়েন্টে ০ (খারাপ), ১ (চলনসই) বা ২ (ভালো) নম্বর দিন। যেসব পয়েন্ট আপনার কাছে বেশি জরুরি (যেমন পানি, যাতায়াত, ড্যাম্প), সেগুলোর নম্বর দ্বিগুণ করুন।
ধরা যাক (উদাহরণ), আপনি ২৫ পয়েন্টে দুটো বাসাকে নম্বর দিলেন। সাধারণ ২২টি পয়েন্টে বাসা ক পেল ৩০, বাসা খ পেল ৩৬। আর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে (যাতায়াত, পানি, ড্যাম্প):
- বাসা ক: যাতায়াত ২, পানি ২, ড্যাম্প ২ = ৬; দ্বিগুণ করে ১২। মোট = ৩০ + ১২ = ৪২
- বাসা খ: যাতায়াত ১, পানি ০, ড্যাম্প ১ = ২; দ্বিগুণ করে ৪। মোট = ৩৬ + ৪ = ৪০
সাধারণ পয়েন্টে বাসা খ এগিয়ে থাকলেও, আপনার কাছে যেগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোতে বাসা ক অনেক ভালো — তাই মোট নম্বরে বাসা ক জিতল। বিশেষ করে বাসা খ-এর পানি সমস্যা (০ নম্বর) প্রতিদিনের ভোগান্তি হতে পারে। নম্বর পদ্ধতি আবেগের বদলে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ওঠার দিনের ছোট চেকলিস্ট
চুক্তি হয়ে গেলেও কাজ শেষ নয়। ওঠার দিন এগুলো করুন:
- প্রতিটি ঘর, বাথরুম, রান্নাঘরের ছবি ও ভিডিও তারিখসহ
- বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মিটার রিডিং লিখে বাড়িওয়ালাকে জানানো
- চাবির সংখ্যা মিলিয়ে নেওয়া
- আগে থেকে থাকা ক্ষতি (ভাঙা টাইলস, দাগ) লিখিতভাবে জানানো
- অগ্রিম ও প্রথম মাসের ভাড়ার রসিদ সংগ্রহ
এই কাজগুলোর জন্য একটি প্রস্তুত ফরম ব্যবহার করতে পারেন — দেখুন বাসায় ওঠার পরিদর্শন ফরমের টেমপ্লেট।
নমুনা মেসেজ (ওঠার দিন বাড়িওয়ালাকে): “আসসালামু আলাইকুম। আজ ১ তারিখে বাসায় উঠলাম। বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং ৪৫৬৭, গ্যাস মিটার (যদি থাকে) ...। বাথরুমের একটি টাইলস আগে থেকেই ভাঙা ও বেডরুমের দেয়ালে দাগ আছে — ছবি পাঠালাম। রেকর্ডের জন্য জানিয়ে রাখলাম। ধন্যবাদ।”
সাধারণ ভুল
- রাতে বা বৃষ্টির দিনে একবার দেখেই চূড়ান্ত: আলো, পানি, ড্যাম্প কোনোটাই ঠিকমতো বোঝা যায় না।
- সদ্য রং দেখে মুগ্ধ হওয়া: রং অনেক সমস্যা ঢেকে রাখে।
- অন্য ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা না বলা: পানি, বাড়িওয়ালার আচরণ, সমস্যা — তাঁরাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
- “সব ঠিক করে দেব” কথায় ভরসা: ওঠার আগে মেরামত শেষ করিয়ে নিন, বা লিখিত নিন।
- মোট খরচ না হিসাব করা: সার্ভিস চার্জ ও গ্যাস যোগ করলে বাজেট ছাড়িয়ে যায়।
- রসিদ ছাড়া অগ্রিম: বাসা ছাড়ার সময় ফেরত পাওয়ার প্রমাণ থাকে না।
- ওঠার দিন ছবি না তোলা: আগের ক্ষতির দায় আপনার ঘাড়ে আসতে পারে।
শেষ কথা
বাসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কয়েক মিনিটের, কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয় কয়েক বছর। এই ২৫ পয়েন্টের চেকলিস্ট হাতে নিয়ে প্রতিটি বাসা একইভাবে যাচাই করলে ভুল বাসায় ওঠার ঝুঁকি অনেক কমে যায়, আর বাড়িওয়ালার সাথে শুরু থেকেই স্পষ্ট সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রশ্ন করতে লজ্জা পাবেন না — একজন ভালো বাড়িওয়ালা পরিষ্কার উত্তর দিতে খুশিই হবেন।
যে বাড়িওয়ালা নিয়মিত লিখিত রসিদ, চুক্তি ও মাসিক বিলের হিসাব দেন, তাঁর সাথে সম্পর্ক সাধারণত সহজ হয়। অনেক বাড়িওয়ালা এখন বাড়িওয়ালা ERP-এর মতো সফটওয়্যারে ইনভয়েস, রসিদ ও সাব-মিটারের বিদ্যুৎ বিল তৈরি করেন — বাসা দেখার সময় জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন তাঁরা কীভাবে হিসাব রাখেন।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে সবচেয়ে জরুরি কী দেখা উচিত?
পানির সরবরাহ ও সময়, দেয়াল-ছাদে ড্যাম্প, বিদ্যুৎ মিটারের ধরন, গ্যাস সংযোগ এবং যাতায়াতের সময় — এগুলো দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
বাসা দেখতে কোন সময় যাওয়া ভালো?
দিনের আলোয়, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে যাওয়া ভালো, যাতে আলো, পানি ও ড্যাম্প ঠিকমতো বোঝা যায়। সম্ভব হলে রাতে একবার এলাকার পরিবেশও দেখে আসুন।
দেয়ালে ড্যাম্প আছে কিনা কীভাবে বুঝব?
দেয়ালের নিচের অংশে লোনা, রং ফুলে ওঠা, কালচে ছোপ বা ছাদে পানির দাগ দেখুন। আলমারি বা আসবাবের পেছনের কোণগুলো বিশেষভাবে পরীক্ষা করুন।
প্রিপেইড মিটার নাকি সাব-মিটার — কোনটা ভাড়াটিয়ার জন্য ভালো?
নিজস্ব প্রিপেইড মিটারে ভাড়াটিয়া নিজে রিচার্জ করেন বলে হিসাব বেশি স্বচ্ছ। সাব-মিটার হলে প্রতি ইউনিটের হার ও হিসাবের পদ্ধতি আগে থেকে জেনে নিন।
বাসা নেওয়ার সময় অন্য ভাড়াটিয়ার সাথে কথা বলা কি ঠিক?
হ্যাঁ, ভদ্রভাবে কথা বললে পানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও বাড়িওয়ালার আচরণ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়, যা শুধু বাসা দেখে বোঝা যায় না।
অগ্রিম দেওয়ার আগে কী নিশ্চিত করব?
যিনি টাকা নিচ্ছেন তিনি প্রকৃত মালিক বা বৈধ প্রতিনিধি কিনা, অগ্রিম জামানত নাকি অগ্রিম ভাড়া, ফেরতের শর্ত কী — এবং অবশ্যই লিখিত রসিদ নিন।
বাসায় ওঠার দিন ছবি তোলা কেন জরুরি?
ওঠার দিনের ছবি থাকলে আগে থেকে থাকা ক্ষতির দায় পরে আপনার উপর আসে না, আর বাসা ছাড়ার সময় জামানত নিষ্পত্তি সহজ হয়।