বাসা ভাড়ার চেয়ে দোকান ভাড়ার হিসাব অনেক বেশি জটিল। দোকানে ভাড়াটিয়া ইন্টেরিয়রে টাকা খরচ করেন, মালামাল রাখেন, কর্মচারী রাখেন, আর অনেক ক্ষেত্রে সালামি বা পজিশনের টাকাও জড়িত থাকে। তাই মুখের কথায় দোকান ভাড়া দিলে কয়েক বছর পর ভাড়া বৃদ্ধি, দোকান হস্তান্তর বা ছেড়ে দেওয়ার সময় বিরোধ প্রায় অনিবার্য। একটি পরিষ্কার দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র (Shop Rent Agreement) এই ঝামেলাগুলো অনেকটাই আগে থেকে মিটিয়ে রাখে।
এই লেখায় রয়েছে একটি পূর্ণ, পূরণযোগ্য বাংলা নমুনা চুক্তিপত্র (ফাঁকা জায়গা ______ চিহ্নিত), প্রতিটি ধারা কেন রাখা হয়েছে তার ব্যাখ্যা, কোন পরিস্থিতিতে কী বদলাবেন, একটি সংখ্যাসহ উদাহরণ এবং সাধারণ ভুলের তালিকা। দোকান ভাড়ার সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানতে দোকান ভাড়ার চুক্তি গাইড পড়তে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ: এই নমুনা সাধারণ তথ্যের জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। স্ট্যাম্পের মূল্য, নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) প্রয়োজন কি না, কর/ভ্যাট ও উৎসে কর কর্তন — এসব বিষয়ে সর্বশেষ বিধান একজন আইনজীবী, কর আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করে নিন।
দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রে কেন আলাদা শর্ত দরকার
বাসার চুক্তিতে মূলত ভাড়া, অগ্রিম, বিল আর ছাড়ার নোটিশ থাকে। দোকানের ক্ষেত্রে এর বাইরে আরও কিছু বিষয় থাকে যেগুলো লিখিত না থাকলে পরে ঝামেলা হয়:
- ব্যবসার ধরন: দোকানে কী ব্যবসা হবে — কারণ রেস্টুরেন্ট বা ওয়ার্কশপ পাশের দোকান ও ভবনের ওপর আলাদা প্রভাব ফেলে।
- সালামি/পজিশন: টাকা নেওয়া হলে তা ফেরতযোগ্য কি না, সমন্বয় হবে কি না।
- ইন্টেরিয়র ও কাঠামো পরিবর্তন: শাটার, দেয়াল, সাইনবোর্ড, এসি বসানোর অনুমতি।
- ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য অনুমতি: সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স কে নেবেন।
- হস্তান্তর (Transfer) ও সাব-লেট: ভাড়াটিয়া দোকান অন্যকে দিতে পারবেন কি না।
- ভাড়া বৃদ্ধির হার ও সময় (Escalation): বছরওয়ারি বা নির্দিষ্ট মেয়াদে কত বাড়বে।
- সার্ভিস চার্জ ও কমন খরচ: মার্কেট বা মলের পাহারা, পরিচ্ছন্নতা, লিফট, জেনারেটর।
দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রের নমুনা (পূর্ণ টেমপ্লেট)
নিচের নমুনাটি কপি করে নিজের তথ্য দিয়ে পূরণ করুন। যে ধারা আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় তা বাদ দিন, আর প্রয়োজন হলে নতুন ধারা যোগ করুন।
দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র
এই চুক্তিপত্র আজ ______ তারিখ (বাংলা ______ সন) ______ স্থানে নিম্নলিখিত পক্ষগণের মধ্যে সম্পাদিত হলো।
পক্ষগণের পরিচয়
প্রথম পক্ষ (মালিক/ভাড়াদাতা): নাম ______, পিতা/স্বামী ______, জাতীয় পরিচয়পত্র নং ______, ঠিকানা ______, মোবাইল ______।
দ্বিতীয় পক্ষ (ভাড়াটিয়া/ভাড়াগ্রহীতা): নাম ______, পিতা/স্বামী ______, জাতীয় পরিচয়পত্র নং ______, প্রতিষ্ঠানের নাম ______, স্থায়ী ঠিকানা ______, বর্তমান ঠিকানা ______, মোবাইল ______।
(প্রতিষ্ঠান হলে: প্রতিষ্ঠানের নাম ______, নিবন্ধন/ট্রেড লাইসেন্স নং ______, অনুমোদিত প্রতিনিধির নাম ও পদবি ______।)
তফসিল (দোকানের বিবরণ)
ভবন/মার্কেটের নাম ______, হোল্ডিং নং ______, রোড ______, এলাকা ______, থানা ______, জেলা ______। দোকান নং ______, তলা ______, আয়তন আনুমানিক ______ বর্গফুট (সামনের দিক ______ ফুট × গভীরতা ______ ফুট)। দোকানের সঙ্গে দেওয়া সুবিধা: শাটার ______টি, বাতি/ফ্যান ______টি, বিদ্যুৎ মিটার/সাব-মিটার নং ______, অন্যান্য ______।
ধারা ১: চুক্তির মেয়াদ
এই চুক্তির মেয়াদ ______ তারিখ থেকে ______ তারিখ পর্যন্ত মোট ______ বছর/মাস। মেয়াদ শেষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নতুন শর্তে চুক্তি নবায়ন করা যাবে। নবায়নের ইচ্ছা মেয়াদ শেষের অন্তত ______ মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
ধারা ২: মাসিক ভাড়া ও পরিশোধ পদ্ধতি
দোকানের মাসিক ভাড়া ______ টাকা (কথায় ______ টাকা) মাত্র। প্রতি ইংরেজি মাসের ______ তারিখের মধ্যে চলতি মাসের ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে। ভাড়া পরিশোধ হবে ব্যাংক হিসাব নং ______ (ব্যাংক ______, শাখা ______) / মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর ______ / নগদে লিখিত রসিদের বিনিময়ে। প্রতিটি পরিশোধের জন্য প্রথম পক্ষ স্বাক্ষরিত রসিদ দেবেন।
ধারা ৩: জামানত (Security Deposit) ও অগ্রিম
দ্বিতীয় পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় জামানত হিসেবে ______ টাকা (কথায় ______) প্রদান করলেন। এই জামানত মাসিক ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য নয় / শেষ ______ মাসের ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য। চুক্তি শেষে দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার পর বকেয়া ভাড়া, বিল ও ক্ষতির খরচ (যদি থাকে) লিখিত হিসাবসহ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ ______ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে।
ধারা ৪: সালামি/পজিশন (প্রযোজ্য হলে)
দ্বিতীয় পক্ষ সালামি/পজিশন বাবদ ______ টাকা প্রদান করলেন। এই অর্থ ফেরতযোগ্য / অফেরতযোগ্য / চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী আনুপাতিক হারে ফেরতযোগ্য (বিবরণ: ______)। দোকান হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সালামির বিষয়ে প্রথম পক্ষের লিখিত সম্মতি ছাড়া কোনো লেনদেন বৈধ বলে গণ্য হবে না।
ধারা ৫: ভাড়া বৃদ্ধি
প্রতি ______ বছর/মাস পর মাসিক ভাড়া বিদ্যমান ভাড়ার ______ শতাংশ হারে / ______ টাকা বৃদ্ধি পাবে। বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার অন্তত ______ দিন আগে প্রথম পক্ষ লিখিত নোটিশ দেবেন। এর বাইরে মেয়াদের মধ্যে একতরফাভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না।
ধারা ৬: বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও সার্ভিস চার্জ
দোকানের বিদ্যুৎ বিল ______ (নিজস্ব মিটার: বিতরণ কোম্পানির বিল দ্বিতীয় পক্ষ সরাসরি পরিশোধ করবেন / সাব-মিটার: প্রতি ইউনিট ______ টাকা হারে প্রথম পক্ষকে পরিশোধ করবেন)। পানি ______। গ্যাস ______। মাসিক সার্ভিস চার্জ ______ টাকা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: পাহারাদার, পরিচ্ছন্নতা, কমন বাতি, ______। সার্ভিস চার্জ পরিবর্তন হলে ______ দিন আগে লিখিতভাবে জানানো হবে।
ধারা ৭: ব্যবসার ধরন ও ব্যবহার
দ্বিতীয় পক্ষ দোকানটি শুধুমাত্র ______ ব্যবসার জন্য ব্যবহার করবেন। প্রথম পক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করা যাবে না। দোকানে কোনো অবৈধ পণ্য, দাহ্য বা বিস্ফোরক দ্রব্য মজুত করা যাবে না, এবং আবাসিক উদ্দেশ্যে রাত্রিযাপন করা যাবে না।
ধারা ৮: ট্রেড লাইসেন্স, কর ও অনুমতি
ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসা-সংক্রান্ত নিবন্ধন ও প্রযোজ্য কর/ভ্যাট দ্বিতীয় পক্ষ নিজ দায়িত্ব ও খরচে সম্পন্ন করবেন। প্রয়োজনে প্রথম পক্ষ এই চুক্তির কপি/ভাড়ার প্রমাণপত্র সরবরাহ করবেন। ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স প্রথম পক্ষ পরিশোধ করবেন। ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর বা ভ্যাট সংক্রান্ত দায়িত্ব প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে: ______।
ধারা ৯: ইন্টেরিয়র, সাইনবোর্ড ও কাঠামোগত পরিবর্তন
দ্বিতীয় পক্ষ নিজ খরচে দোকানের ভেতরের সাজসজ্জা করতে পারবেন। দেয়াল ভাঙা, নতুন দরজা/জানালা, শাটার পরিবর্তন, এসি আউটডোর বসানো বা বৈদ্যুতিক লোড বাড়ানোর আগে প্রথম পক্ষের লিখিত অনুমতি লাগবে। সাইনবোর্ডের আকার ও স্থান ______। চুক্তি শেষে দ্বিতীয় পক্ষ স্থানান্তরযোগ্য ফিটিংস নিয়ে যেতে পারবেন, তবে দেয়ালে/মেঝেতে ক্ষতি হলে তা মেরামত করে দিতে হবে / খরচ জামানত থেকে কাটা হবে।
ধারা ১০: রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত
দোকানের ভেতরের ছোটখাটো মেরামত (বাতি, সুইচ, তালা, শাটারের তেল) দ্বিতীয় পক্ষ করবেন। ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, মূল দেয়ালের ফাটল, প্রধান বৈদ্যুতিক বা পানির লাইনের সমস্যা প্রথম পক্ষ মেরামত করবেন, যদি না তা দ্বিতীয় পক্ষের অবহেলায় ঘটে। জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় পক্ষ সঙ্গে সঙ্গে প্রথম পক্ষকে জানাবেন।
ধারা ১১: হস্তান্তর ও সাব-লেট
প্রথম পক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় পক্ষ দোকান বা তার কোনো অংশ অন্য কাউকে সাব-লেট, হস্তান্তর বা অংশীদারিত্বে দিতে পারবেন না। অনুমতি দেওয়া হলে নতুন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পাদিত হবে।
ধারা ১২: ভাড়া বকেয়া ও বিলম্ব
নির্ধারিত তারিখের পর ______ দিনের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ না হলে প্রথম পক্ষ লিখিত তাগাদা দেবেন। টানা ______ মাস ভাড়া বকেয়া থাকলে প্রথম পক্ষ প্রচলিত আইন অনুযায়ী চুক্তি বাতিলের নোটিশ দিতে পারবেন। বিলম্ব ফি (যদি থাকে): ______।
ধারা ১৩: চুক্তি বাতিল ও দোকান ছাড়ার নোটিশ
যেকোনো পক্ষ চুক্তির মেয়াদের আগে দোকান ছাড়তে/ছাড়াতে চাইলে অন্তত ______ মাস আগে লিখিত নোটিশ দেবেন। ন্যূনতম লক-ইন মেয়াদ ______ মাস, এর আগে দ্বিতীয় পক্ষ দোকান ছাড়লে ______। দোকান ছাড়ার দিন উভয় পক্ষ উপস্থিত থেকে হ্যান্ডওভার তালিকা মিলিয়ে চাবি বুঝিয়ে দেবেন।
ধারা ১৪: প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা ও বীমা
যুক্তিসংগত সময়ে আগাম জানিয়ে প্রথম পক্ষ বা তার প্রতিনিধি পরিদর্শনের জন্য দোকানে প্রবেশ করতে পারবেন। দোকানের মালামালের নিরাপত্তা ও বীমা দ্বিতীয় পক্ষের দায়িত্ব। দ্বিতীয় পক্ষ দোকানে কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখবেন।
ধারা ১৫: বিরোধ নিষ্পত্তি ও বিবিধ
এই চুক্তি নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে উভয় পক্ষ প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে, প্রয়োজনে মার্কেট কমিটি/স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করবেন; ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এই চুক্তির যেকোনো সংশোধন লিখিত ও উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত হতে হবে। চুক্তির দুই কপি প্রস্তুত করা হলো, প্রত্যেক পক্ষ একটি করে রাখবেন।
প্রথম পক্ষের স্বাক্ষর: ______ তারিখ: ______
দ্বিতীয় পক্ষের স্বাক্ষর: ______ তারিখ: ______
সাক্ষী ১: নাম ______, ঠিকানা ______, স্বাক্ষর ______
সাক্ষী ২: নাম ______, ঠিকানা ______, স্বাক্ষর ______
নমুনাটি কীভাবে পূরণ ও কাস্টমাইজ করবেন
পক্ষগণ ও তফসিল পূরণের নিয়ম
নাম, পিতার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর হুবহু এনআইডি অনুযায়ী লিখুন। ভাড়াটিয়া যদি কোনো কোম্পানি হয়, তবে ব্যক্তির নামে নয়, প্রতিষ্ঠানের নামে চুক্তি করুন এবং স্বাক্ষরকারী প্রতিনিধির ক্ষমতাপত্র বা বোর্ড অনুমোদনের কপি চেয়ে নিন। তফসিলে দোকানের মাপ, নম্বর ও মিটার নম্বর লিখলে পরে “কোন দোকান” নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না।
একক দোকান বনাম মার্কেট বা মলের দোকান
| বিষয় | রাস্তার পাশের একক দোকান | মার্কেট/শপিং মলের দোকান |
|---|---|---|
| সার্ভিস চার্জ | সাধারণত থাকে না বা কম | প্রায় সবসময় থাকে; ধারা ৬ বিস্তারিত লিখুন |
| খোলা-বন্ধের সময় | ভাড়াটিয়ার ইচ্ছামতো | মার্কেটের নিয়ম মানতে হয়; আলাদা ধারা যোগ করুন |
| বিদ্যুৎ | অনেক ক্ষেত্রে আলাদা মিটার | সাব-মিটার বেশি প্রচলিত |
| সাইনবোর্ড | তুলনামূলক স্বাধীন | মলের ডিজাইন নির্দেশিকা মানতে হয় |
| মার্কেট কমিটি | প্রযোজ্য নয় | কমিটির নিয়ম চুক্তির সংযুক্তি হিসেবে দিন |
মার্কেটের ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ কীভাবে ঠিক করবেন তা নিয়ে দেখুন শপিং মলের সার্ভিস চার্জ।
ভাড়া বৃদ্ধির ধারা কীভাবে লিখবেন
দোকানের চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি বিরোধ হয় ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। তাই শতাংশ বা টাকার অঙ্ক এবং সময় দুটোই স্পষ্ট লিখুন। নিচের উদাহরণটি দেখুন।
ধরা যাক (উদাহরণ), দোকানের শুরুর ভাড়া ২৫,০০০ টাকা, চুক্তি ৫ বছরের, আর শর্ত হলো প্রতি ২ বছর পর ১০% বৃদ্ধি। তাহলে:
| সময়কাল | হিসাব | মাসিক ভাড়া |
|---|---|---|
| ১ম–২য় বছর | শুরুর ভাড়া | ২৫,০০০ টাকা |
| ৩য়–৪র্থ বছর | ২৫,০০০ + (২৫,০০০ × ১০%) = ২৫,০০০ + ২,৫০০ | ২৭,৫০০ টাকা |
| ৫ম বছর | ২৭,৫০০ + (২৭,৫০০ × ১০%) = ২৭,৫০০ + ২,৭৫০ | ৩০,২৫০ টাকা |
এখানে দ্বিতীয় বৃদ্ধি হয়েছে বিদ্যমান ভাড়ার ওপর (চক্রবৃদ্ধি)। আপনি যদি প্রতিবার শুরুর ভাড়ার ওপর ১০% ধরতে চান, তবে ৫ম বছরে ভাড়া হবে ২৭,৫০০ + ২,৫০০ = ৩০,০০০ টাকা। দুই হিসাবে ২৫০ টাকা পার্থক্য — ছোট মনে হলেও চুক্তিতে “বিদ্যমান ভাড়ার” নাকি “শুরুর ভাড়ার” তা না লিখলে এ নিয়েই বিরোধ হয়। একইভাবে জামানত যদি ৩ মাসের ভাড়া হয় তবে শুরুতে তা ২৫,০০০ × ৩ = ৭৫,০০০ টাকা; ভাড়া বাড়লে জামানতও বাড়বে কি না তাও চুক্তিতে লিখুন। বিস্তারিত: বাণিজ্যিক ভাড়া বৃদ্ধির ধারা।
সালামি/পজিশনের ধারা নিয়ে সতর্কতা
সালামি বা পজিশন বাংলাদেশের মার্কেটগুলোতে প্রচলিত হলেও এটি অনেক বিরোধের উৎস। টাকা নিলে চুক্তিতে পরিমাণ, প্রাপ্তির তারিখ, ফেরতযোগ্য কি না এবং হস্তান্তরের নিয়ম পরিষ্কার লিখুন। আইনগত অবস্থান ও কর-সংক্রান্ত বিষয় জটিল হতে পারে, তাই বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনজীবীর পরামর্শ নিন। বিস্তারিত পড়ুন দোকানের পজিশন ও সালামি গাইড।
ফিট-আউট বা ভাড়ামুক্ত সময়
বড় শোরুম বা রেস্টুরেন্টের ইন্টেরিয়রে কয়েক সপ্তাহ লাগে। অনেক মালিক এই সময়টুকু ভাড়ামুক্ত বা কম ভাড়ায় দেন। দিলে ধারা ২-এর পর একটি বাক্য যোগ করুন: “______ তারিখ থেকে ______ তারিখ পর্যন্ত ফিট-আউট সময়ে ভাড়া প্রযোজ্য হবে না / ______ টাকা প্রযোজ্য হবে; তবে বিদ্যুৎ ও সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য।”
স্ট্যাম্প, নিবন্ধন ও সংযুক্তি
চুক্তি সাধারণত নির্দিষ্ট মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লেখা হয়। কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের বেশি হলে নিবন্ধন আবশ্যক কি না — এগুলো Stamp Act 1899 ও Registration Act 1908 এবং সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, যা সময়ে সময়ে বদলায়। তাই নির্দিষ্ট অঙ্ক বা মেয়াদ ধরে নেওয়ার আগে আইনজীবী বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে যাচাই করুন। বিস্তারিত: ভাড়ার চুক্তির স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন।
চুক্তির সঙ্গে যা সংযুক্ত করবেন:
- উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
- প্রতিষ্ঠান হলে ট্রেড লাইসেন্স/নিবন্ধনের কপি ও প্রতিনিধির অনুমতিপত্র
- দোকান হস্তান্তরের সময়ের জিনিসপত্রের তালিকা ও মিটার রিডিং (দেখুন হ্যান্ডওভার/ইনভেন্টরি ফরমের নমুনা)
- মার্কেটের নিয়মাবলি (প্রযোজ্য হলে)
- জামানত ও সালামি প্রাপ্তির রসিদ
স্বাক্ষরের আগে চেকলিস্ট
| যাচাই | হ্যাঁ/না |
|---|---|
| ভাড়ার অঙ্ক সংখ্যায় ও কথায় মিলেছে | ______ |
| ভাড়া পরিশোধের তারিখ ও পদ্ধতি লেখা | ______ |
| জামানত সমন্বয়যোগ্য কি না স্পষ্ট | ______ |
| সালামির ফেরত-শর্ত লেখা (প্রযোজ্য হলে) | ______ |
| ভাড়া বৃদ্ধির হার ও ভিত্তি (শুরুর/বিদ্যমান ভাড়া) লেখা | ______ |
| বিদ্যুৎ ও সার্ভিস চার্জের হিসাব পরিষ্কার | ______ |
| ব্যবসার ধরন উল্লেখ আছে | ______ |
| নোটিশ মেয়াদ ও লক-ইন লেখা | ______ |
| প্রতিটি পাতায় উভয় পক্ষের অনুস্বাক্ষর | ______ |
| দুজন সাক্ষীর নাম-ঠিকানা-স্বাক্ষর | ______ |
সাধারণ ভুল
- ব্যক্তির নামে চুক্তি, অথচ ব্যবসা কোম্পানির — পরে ব্যক্তি সরে গেলে কোম্পানিকে দায়ী করা কঠিন হয়।
- “প্রতি বছর ভাড়া বাড়বে” লিখে হার না দেওয়া — প্রতিবছর দর কষাকষি ও তিক্ততা।
- সালামি নিয়ে রসিদ না দেওয়া বা চুক্তিতে না লেখা — পরে ফেরত নিয়ে বিরোধে প্রমাণ থাকে না।
- সাব-মিটারের ইউনিট রেট না লেখা — বিল নিয়ে প্রতি মাসে তর্ক; সাব-মিটারের হিসাব বুঝতে দেখুন মার্কেটের দোকানের বিদ্যুৎ বিলিং।
- হ্যান্ডওভার তালিকা না রাখা — দোকান ছাড়ার সময় ক্ষতি প্রমাণ করা যায় না।
- রসিদ ছাড়া নগদ ভাড়া — উভয় পক্ষেরই প্রমাণ থাকে না; রসিদের ফরম্যাট পাবেন ভাড়ার রসিদের নমুনা-তে।
- ইন্টারনেট থেকে নামানো চুক্তি না বুঝে সই — প্রতিটি ধারা নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
চুক্তির পর: প্রতি মাসের ব্যবস্থাপনা
চুক্তি সই হওয়া মানে কাজ শেষ নয়। প্রতি মাসে ভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিলের ইনভয়েস, পরিশোধের রসিদ, বকেয়ার হিসাব এবং বৃদ্ধির তারিখ মনে রাখতে হয়। অনেকগুলো দোকান থাকলে একটি রেন্ট রোল বা তালিকা রাখা খুব কাজে দেয় — কোন দোকানে কে, ভাড়া কত, চুক্তি কবে শেষ। এ বিষয়ে পড়ুন রেন্ট রোল কী।
শেষ কথা
দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র যত স্পষ্ট হবে, মালিক ও ব্যবসায়ীর সম্পর্ক তত দীর্ঘ ও ঝামেলামুক্ত হবে। ওপরের নমুনাটি একটি শক্ত ভিত্তি, তবে বড় অঙ্কের সালামি, দীর্ঘমেয়াদি কর্পোরেট ভাড়া বা বিশেষ শর্তের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরের আগে অবশ্যই আইনজীবীকে দেখিয়ে নিন।
মার্কেট বা একাধিক দোকানের মালিকদের জন্য বাড়িওয়ালা ERP-তে প্রতিটি দোকানকে ইউনিট হিসেবে রেখে চুক্তি, মাসিক ইনভয়েস (একসঙ্গে বাল্ক), সাব-মিটার বিদ্যুৎ বিল, রসিদ ও বকেয়া তালিকা এক জায়গায় রাখা যায়, আর এসএমএস রিমাইন্ডারও পাঠানো যায়। কাগজের চুক্তির পাশাপাশি হিসাব গুছিয়ে রাখতে চাইলে এটি কাজে আসতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র কত টাকার স্ট্যাম্পে করতে হয়?
স্ট্যাম্পের মূল্য চুক্তির মেয়াদ ও ভাড়ার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে এবং বিধান সময়ে সময়ে বদলায়। সঠিক অঙ্ক জানতে আইনজীবী বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে যাচাই করে নিন।
দোকান ভাড়ার চুক্তি কি রেজিস্ট্রেশন করতে হয়?
চুক্তির মেয়াদ ও ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন আবশ্যক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আগে একজন আইনজীবীর কাছ থেকে প্রযোজ্য বিধান নিশ্চিত হয়ে নিন।
সালামির টাকা কি চুক্তিপত্রে লেখা উচিত?
হ্যাঁ। পরিমাণ, প্রাপ্তির তারিখ, ফেরতযোগ্য কি না এবং হস্তান্তরের শর্ত লিখে রাখলে পরে বিরোধ হলে উভয় পক্ষের কাছে প্রমাণ থাকে।
দোকানের ভাড়া প্রতি বছর কত শতাংশ বাড়ানো যায়?
আইনে ভাড়া-সংক্রান্ত বিধান আছে, আর বাস্তবে হার সাধারণত উভয় পক্ষের সম্মতিতে চুক্তিতে ঠিক হয়। হার, সময় এবং ভিত্তি (শুরুর নাকি বিদ্যমান ভাড়া) স্পষ্ট লিখুন এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
দোকানের ট্রেড লাইসেন্স কে করবে — মালিক না ভাড়াটিয়া?
সাধারণত যিনি ব্যবসা করছেন সেই ভাড়াটিয়াই ট্রেড লাইসেন্স নেন, আর মালিক প্রয়োজনে চুক্তির কপি বা ভাড়ার প্রমাণ দেন। বিষয়টি চুক্তিতে লিখে রাখা ভালো।
ভাড়াটিয়া দোকান অন্য কাউকে হস্তান্তর করতে পারবে কি?
চুক্তিতে যা লেখা থাকবে সেটাই মূল ভিত্তি। সাধারণত মালিকের লিখিত অনুমতি ছাড়া সাব-লেট বা হস্তান্তর নিষেধ রাখা হয় এবং অনুমতি দিলে নতুন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়।
দোকান ছাড়ার জন্য কত দিনের নোটিশ দিতে হয়?
নোটিশের মেয়াদ চুক্তিতে নির্ধারিত হয়; দোকানের ক্ষেত্রে অনেকে এক থেকে তিন মাস রাখেন। চুক্তিতে যে মেয়াদ লেখা আছে, তা লিখিতভাবে মেনে নোটিশ দিন।