একটি ছয়তলা বাড়িতে বারোটি ফ্ল্যাট, কিংবা একটি মার্কেটে পঞ্চাশটি দোকান — মাস শেষে বাড়িওয়ালার মাথায় একই প্রশ্ন: কোন ইউনিটে কে আছেন, কত ভাড়া, কে দিয়েছেন আর কে দেননি, কার চুক্তি সামনের মাসে শেষ, কোনটা খালি? খাতায় এলোমেলো লেখা বা মাথায় রাখা হিসাব দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দ্রুত পাওয়া যায় না। এখানেই কাজে আসে রেন্ট রোল (Rent Roll) — এক পাতার একটি সারণি, যা পুরো প্রপার্টির ভাড়ার ছবি একসঙ্গে দেখায়।

এই লেখায় জানবেন রেন্ট রোল কী, এতে কোন কোন কলাম রাখা হয়, লেজার বা ইনভয়েস থেকে এটি কীভাবে আলাদা, একটি নমুনা রেন্ট রোল ও তা থেকে হিসাবের উদাহরণ, কীভাবে বানাবেন ও হালনাগাদ রাখবেন, বাসা, মার্কেট ও মিশ্র ভবনে এর ব্যবহার এবং সাধারণ ভুল।

রেন্ট রোল কী: সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা

রেন্ট রোল হলো একটি নির্দিষ্ট তারিখে কোনো প্রপার্টির প্রতিটি ভাড়াযোগ্য ইউনিটের তালিকা, যেখানে প্রতিটি ইউনিটের ভাড়াটিয়ার নাম, মাসিক ভাড়া, চুক্তির শুরু ও শেষের তারিখ, জামানত, বর্তমান বকেয়া এবং ইউনিটটি ভাড়া দেওয়া আছে না খালি — এসব তথ্য এক সারিতে থাকে। বাংলায় একে সহজভাবে “ভাড়ার তালিকা” বা “ভাড়াটিয়া-ভাড়ার সারসংক্ষেপ” বলা যায়।

রেন্ট রোলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি স্ন্যাপশট — নির্দিষ্ট দিনের ছবি। তাই প্রতিটি রেন্ট রোলে “যে তারিখ পর্যন্ত” (As of Date) লেখা থাকা জরুরি।

রেন্ট রোল কেন দরকার

  • এক নজরে পুরো প্রপার্টি: কতটি ইউনিট ভাড়া আছে, কতটি খালি, মোট প্রত্যাশিত আয় কত।
  • বকেয়া চিহ্নিত করা: কোন ইউনিটে কত টাকা বকেয়া, কত দিন ধরে।
  • চুক্তি নবায়ন ও ভাড়া বৃদ্ধির পরিকল্পনা: কার চুক্তি কবে শেষ, তা আগে থেকে জানলে আলোচনা সময়মতো শুরু করা যায়।
  • খালি ইউনিট দ্রুত ভাড়া দেওয়া: কোন ইউনিট কবে খালি হবে তা আগে জানলে বিজ্ঞাপন আগেই দেওয়া যায়।
  • পরিবারের সদস্য বা ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব দেওয়া: বিদেশে থাকা মালিক বা একাধিক অংশীদার থাকলে রেন্ট রোল দেখে সবাই একই তথ্য পান।
  • ব্যাংক ঋণ, প্রপার্টি বিক্রি বা মূল্যায়ন: ভাড়া থেকে আয় কত তা দেখাতে রেন্ট রোল একটি সাধারণ নথি।
  • আয়কর প্রস্তুতি: বছরের ভাড়ার আয় হিসাবের একটি ভিত্তি (বিস্তারিত: বাড়ি ভাড়ার আয়কর)।

রেন্ট রোলে কোন কোন কলাম থাকে

কলামকী লিখবেনকেন দরকার
ইউনিট নংফ্ল্যাট/দোকান নম্বর, তলাপ্রতিটি সারির পরিচয়
ধরন ও আয়তন২ বেড/৩ বেড/দোকান, বর্গফুটপ্রতি বর্গফুট ভাড়ার তুলনা
অবস্থাভাড়া দেওয়া / খালি / নোটিশ দেওয়াখালি হার ও পরিকল্পনা
ভাড়াটিয়ার নাম ও মোবাইলচুক্তি অনুযায়ীযোগাযোগ
চুক্তি শুরু ও শেষতারিখনবায়ন ও ভাড়া বৃদ্ধির সময়
মাসিক ভাড়ামূল ভাড়াপ্রত্যাশিত আয়
সার্ভিস চার্জ/অন্যান্যমাসিক নির্দিষ্ট চার্জমোট প্রাপ্য
জামানত/অগ্রিমজমা থাকা অঙ্কবাসা ছাড়ার সময় সমন্বয়
চলতি মাসে পরিশোধটাকা ও তারিখআদায়ের অবস্থা
মোট বকেয়াআগের ও চলতি মিলিয়েআদায়ের অগ্রাধিকার
পরবর্তী ভাড়া বৃদ্ধির তারিখচুক্তি অনুযায়ীপরিকল্পনা
মন্তব্যবিশেষ শর্ত, সালামি ইত্যাদিপ্রাসঙ্গিক নোট

ছোট বাড়ির জন্য এর সবগুলো কলাম লাগবে না; ইউনিট, ভাড়াটিয়া, ভাড়া, চুক্তির শেষ তারিখ, পরিশোধ ও বকেয়া — এই ছয়টি দিয়েই শুরু করা যায়।

রেন্ট রোল, লেজার ও ইনভয়েস: পার্থক্য

নথিকী দেখায়পরিধি
রেন্ট রোলনির্দিষ্ট দিনে সব ইউনিটের সারসংক্ষেপপুরো প্রপার্টি, এক সারিতে এক ইউনিট
লেজার (Ledger)একজন ভাড়াটিয়া বা একটি খাতের সব লেনদেন তারিখ অনুযায়ীএকটি হিসাব, সময়ের ধারাবাহিকতায়
ইনভয়েস (Invoice)একটি নির্দিষ্ট মাসে একজন ভাড়াটিয়ার কাছে প্রাপ্য বিলএকটি বিল
রসিদ (Receipt)একটি পরিশোধের প্রমাণএকটি লেনদেন

সহজভাবে বললে, ইনভয়েস ও রসিদ থেকে লেজার তৈরি হয়, আর লেজারের শেষ অবস্থা থেকে রেন্ট রোল তৈরি হয়। বিস্তারিত দেখুন লেজার কী এবং ইনভয়েস কী।

নমুনা রেন্ট রোল ও হিসাবের উদাহরণ

ধরা যাক (উদাহরণ), একটি ছোট ভবনে ৬টি ফ্ল্যাট। রেন্ট রোল তৈরি হয়েছে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত:

ইউনিটঅবস্থাচুক্তি শেষমাসিক ভাড়াচলতি মাসে পরিশোধমোট বকেয়া
১-এভাড়া দেওয়া৩১ ডিসেম্বর১৫,০০০১৫,০০০০
১-বিভাড়া দেওয়া৩০ জুন১৫,০০০০৩০,০০০
২-এভাড়া দেওয়া৩১ মার্চ১৮,০০০১৮,০০০০
২-বিখালি—(১৮,০০০ প্রস্তাবিত)——
৩-এভাড়া দেওয়া৩০ সেপ্টেম্বর২০,০০০১০,০০০১০,০০০
৩-বিনোটিশ দেওয়া (আগামী মাসে ছাড়বেন)—২০,০০০২০,০০০০

এই রেন্ট রোল থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব সহজেই বের করা যায়:

  • সম্ভাব্য পূর্ণ মাসিক আয় (সব ইউনিট ভাড়া থাকলে): ১৫,০০০ + ১৫,০০০ + ১৮,০০০ + ১৮,০০০ + ২০,০০০ + ২০,০০০ = ১,০৬,০০০ টাকা।
  • বর্তমানে ভাড়া দেওয়া ইউনিটের প্রত্যাশিত আয়: ১,০৬,০০০ − ১৮,০০০ (খালি ২-বি) = ৮৮,০০০ টাকা।
  • চলতি মাসে আদায়: ১৫,০০০ + ০ + ১৮,০০০ + ১০,০০০ + ২০,০০০ = ৬৩,০০০ টাকা।
  • আদায়ের হার: ৬৩,০০০ ÷ ৮৮,০০০ × ১০০ ≈ ৭১.৬%।
  • মোট বকেয়া: ৩০,০০০ + ১০,০০০ = ৪০,০০০ টাকা (১-বি-তে দুই মাসের বকেয়া — অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যোগাযোগ দরকার)।
  • খালি হার (ইউনিট সংখ্যায়): ৬টির মধ্যে ১টি খালি = ১ ÷ ৬ × ১০০ ≈ ১৬.৭%; আগামী মাসে ৩-বি খালি হলে ২ ÷ ৬ × ১০০ ≈ ৩৩.৩%।
  • খালি ইউনিটে মাসিক আয় হারানো: ১৮,০০০ টাকা; ৩-বি খালি হলে আরও ২০,০০০ টাকা, অর্থাৎ মোট ৩৮,০০০ টাকা।

শুধু একটি সারণি থেকেই বোঝা গেল: ১-বি-র বকেয়া নিয়ে এখনই কথা বলতে হবে, ২-বি ও ৩-বি-র জন্য বিজ্ঞাপন আজই দেওয়া দরকার, আর ২-এ-র চুক্তি ৩১ মার্চ শেষ বলে নবায়নের আলোচনা কয়েক মাস আগে শুরু করা উচিত। খালি হার নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন ভ্যাকান্সি রেট কী, আর খালি ইউনিটের বিজ্ঞাপনের জন্য টু-লেট বিজ্ঞাপনের নমুনা।

কীভাবে রেন্ট রোল বানাবেন: ধাপে ধাপে

  1. সব ইউনিটের তালিকা করুন: খালি ইউনিটসহ। খালি ইউনিট বাদ দিলে প্রকৃত ছবি পাওয়া যায় না।
  2. চুক্তিপত্র থেকে তথ্য তুলুন: ভাড়াটিয়ার নাম, ভাড়া, চুক্তির তারিখ, জামানত, বৃদ্ধির শর্ত।
  3. ভাড়ার খাতা বা রসিদ থেকে পরিশোধ তুলুন: চলতি মাসে কে কত দিয়েছেন।
  4. বকেয়া হিসাব করুন: আগের বকেয়া + চলতি মাসের প্রাপ্য − চলতি মাসের পরিশোধ।
  5. তারিখ লিখুন: “______ তারিখ পর্যন্ত” — প্রতিটি রেন্ট রোলের ওপরে।
  6. সারসংক্ষেপ যোগ করুন: মোট ইউনিট, ভাড়া দেওয়া, খালি, প্রত্যাশিত আয়, আদায়, বকেয়া।
  7. নিয়মিত হালনাগাদ করুন: অন্তত মাসে একবার, আদর্শভাবে প্রতিটি পরিশোধের পর।

বকেয়া হিসাবের সূত্র

বর্তমান বকেয়া = আগের মাসের শেষ বকেয়া + চলতি মাসের মোট প্রাপ্য (ভাড়া + সার্ভিস চার্জ + বিল) − চলতি মাসে পরিশোধ

যেমন, আগের বকেয়া ৫,০০০, চলতি প্রাপ্য ২০,০০০, পরিশোধ ১৫,০০০ হলে বর্তমান বকেয়া = ৫,০০০ + ২০,০০০ − ১৫,০০০ = ১০,০০০ টাকা। বকেয়া নিয়ে আরও জানতে দেখুন বকেয়া ভাড়া কী।

খাতা, এক্সেল নাকি সফটওয়্যার

পদ্ধতিসুবিধাসীমাবদ্ধতা
কাগজের খাতাসহজ, খরচ নেইহিসাব হাতে করতে হয়, ভুল ও হারানোর ঝুঁকি, শেয়ার করা কঠিন
এক্সেল/গুগল শিটসূত্র দিয়ে স্বয়ংক্রিয় যোগফল, ফিল্টারপ্রতিটি পরিশোধ হাতে তুলতে হয়, একাধিক ফাইলে গরমিল হতে পারে
রেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারইনভয়েস ও পরিশোধ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিপোর্টশুরুতে ডেটা তোলা ও শেখার সময় লাগে, সাবস্ক্রিপশন খরচ থাকতে পারে

৫–১০টি ইউনিট পর্যন্ত এক্সেল ভালোভাবেই চলে। ইউনিট বেশি হলে বা একাধিক ভবন থাকলে সফটওয়্যারের সুবিধা বাড়ে। তুলনামূলক আলোচনা পাবেন এক্সেল বনাম রেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার-এ।

এক্সেল বা গুগল শিটে সহজ রেন্ট রোল

যারা এক্সেল বা গুগল শিট দিয়ে শুরু করতে চান, তাদের জন্য একটি সহজ কাঠামো: প্রথম সারিতে কলামের নাম — A: ইউনিট, B: ভাড়াটিয়া, C: অবস্থা, D: চুক্তি শেষ, E: মাসিক ভাড়া, F: আগের বকেয়া, G: চলতি পরিশোধ, H: বর্তমান বকেয়া। H কলামে সূত্র বসান: = F + E − G। তারপর নিচে একটি সারসংক্ষেপ সারি রাখুন যেখানে E, G ও H কলামের যোগফল (SUM) থাকবে। “অবস্থা” কলামে শুধু তিনটি মান ব্যবহার করুন — ভাড়া দেওয়া, খালি, নোটিশ — যাতে ফিল্টার করে সহজে খালি ইউনিট দেখা যায়। প্রতি মাসের জন্য একটি নতুন শিট কপি করে নিন, আর আগের মাসের H কলামের মান নতুন শিটের F কলামে বসান। এভাবে মাসওয়ারি ইতিহাসও থেকে যায়।

টিপ: চুক্তি শেষের তারিখ কলামে শর্তসাপেক্ষ রং (Conditional Formatting) দিন — আগামী ৬০ দিনের মধ্যে শেষ হলে হলুদ, পার হয়ে গেলে লাল। তাহলে নবায়নের কথা ভুলে যাওয়ার সুযোগ কমে।

বার্ষিক রেন্ট রোল ও আয়ের সারসংক্ষেপ

মাসিক রেন্ট রোলের পাশাপাশি বছরে একবার একটি বার্ষিক সারসংক্ষেপ বানানো উপকারী। এতে প্রতিটি ইউনিটের জন্য থাকবে: বছরে কত মাস ভাড়া ছিল, কত মাস খালি, মোট প্রাপ্য, মোট আদায় এবং বছর শেষের বকেয়া। এই হিসাব থেকে বোঝা যায় কোন ইউনিট বারবার খালি হচ্ছে বা কোথায় বকেয়া জমে থাকার প্রবণতা আছে। আয়কর বিবরণী তৈরির সময় বা আয়-ব্যয়ের রিপোর্ট বানাতেও এটি কাজে লাগে; আয়-ব্যয় রিপোর্টের পদ্ধতি জানতে দেখুন ভাড়ার আয়-ব্যয় রিপোর্ট।

বিদেশে থাকা মালিক ও যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে

যারা প্রবাসে থেকে দেশে বাড়ি ভাড়া দেন, বা যেখানে কয়েকজন ভাই-বোন উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বাড়ির মালিক, সেখানে রেন্ট রোল হলো স্বচ্ছতার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার। দেশে থাকা আত্মীয় বা ব্যবস্থাপক প্রতি মাসে একটি হালনাগাদ রেন্ট রোল পাঠালে সবাই একই তথ্য দেখেন, আর “কত টাকা এলো, কোথায় গেল” নিয়ে সন্দেহ কমে। সঙ্গে খরচের একটি ছোট তালিকা (মেরামত, কেয়ারটেকারের বেতন) জুড়ে দিলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। বিস্তারিত পড়ুন বিদেশ থেকে ভাড়ার প্রপার্টি ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ বা উত্তরাধিকার সম্পত্তির ভাড়া ভাগাভাগি।

বিভিন্ন ধরনের প্রপার্টিতে রেন্ট রোল

আবাসিক বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট

ফ্ল্যাটভিত্তিক সারি, সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ও সাব-মিটার বিদ্যুৎ বিলের কলাম। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বা পার্কিং নম্বরের মতো তথ্য মন্তব্যে রাখা যায়।

মার্কেট ও শপিং মল

দোকানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় রেন্ট রোল এখানে সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। বাড়তি কলাম রাখুন: আয়তন (বর্গফুট), প্রতি বর্গফুট ভাড়া, ব্যবসার ধরন, সালামি/পজিশনের শর্ত, বার্ষিক ভাড়া বৃদ্ধির হার ও তারিখ। প্রতি বর্গফুট ভাড়ার তুলনা করে বোঝা যায় কোন দোকান বাজারের তুলনায় কম ভাড়ায় আছে। বিস্তারিত দেখুন মার্কেটের রেন্ট রোল রিপোর্ট, আর সালামি বোঝার জন্য সালামি/পজিশন কী।

মেস, হোস্টেল ও সিটভিত্তিক ভাড়া

এখানে ইউনিট মানে সিট। প্রতিটি সিটকে আলাদা সারি ধরুন, রুম নম্বর গ্রুপ হিসেবে রাখুন। সিট বদল বেশি হয় বলে রেন্ট রোল ঘনঘন হালনাগাদ করতে হয়।

মিশ্র ব্যবহারের ভবন

নিচে দোকান, ওপরে ফ্ল্যাট হলে একটি কলাম রাখুন “ব্যবহারের ধরন” (আবাসিক/বাণিজ্যিক), যাতে দুই ধরনের আয় আলাদা করে দেখা যায়; কারণ চুক্তি, সার্ভিস চার্জ ও কর-সংক্রান্ত বিষয় দুটোর ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

রেন্ট রোল থেকে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যায়

রেন্ট রোল দেখে প্রতি মাসে যে তিনটি প্রশ্ন করবেন

রেন্ট রোল বানানোর চেয়েও জরুরি হলো নিয়মিত সেটি পড়া। প্রতি মাসের শেষে পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন। এক, কোন ইউনিটে বকেয়া দুই মাস বা তার বেশি? সেখানে আজই যোগাযোগ করুন। দুই, আগামী ৬০ থেকে ৯০ দিনে কার চুক্তি শেষ বা কে বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন? সেই ইউনিটের জন্য নবায়ন বা নতুন ভাড়াটিয়া খোঁজার পরিকল্পনা শুরু করুন। তিন, আগের মাসের তুলনায় আদায়ের হার বেড়েছে না কমেছে? কমে থাকলে কারণ খুঁজুন — রিমাইন্ডার দেরিতে গেছে, নাকি নির্দিষ্ট কয়েকজন নিয়মিত দেরি করছেন। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই আপনার পরের মাসের কাজের তালিকা।

  • বকেয়া আদায়ের অগ্রাধিকার: সবচেয়ে বড় ও পুরোনো বকেয়া আগে। ভদ্রভাবে আদায়ের কৌশল: বকেয়া ভাড়া আদায়ের ভদ্র কৌশল।
  • ভাড়া বৃদ্ধির পরিকল্পনা: কোন ইউনিটের ভাড়া দীর্ঘদিন বাড়েনি এবং চুক্তি অনুযায়ী কবে বাড়ানো যায়।
  • নবায়নের আলোচনা: আগামী ২–৩ মাসে যাদের চুক্তি শেষ, তাদের সঙ্গে আগেই কথা বলা।
  • রক্ষণাবেক্ষণের সময়: ইউনিট খালি হওয়ার সময়টিই সংস্কারের সবচেয়ে ভালো সুযোগ।
  • আয়ের পূর্বাভাস: আগামী মাস বা বছরের সম্ভাব্য আয় ও নগদ প্রবাহ।

সাধারণ ভুল

  1. খালি ইউনিট তালিকা থেকে বাদ দেওয়া: তাহলে খালি হার ও আয় হারানোর চিত্র দেখা যায় না।
  2. তারিখ না লেখা: কোন দিনের অবস্থা, তা না জানলে পুরোনো রেন্ট রোল দেখে ভুল সিদ্ধান্ত হয়।
  3. আংশিক পরিশোধ না তোলা: বকেয়া বেশি বা কম দেখায়।
  4. জামানতকে আয় ধরে ফেলা: জামানত ভাড়াটিয়ার ফেরতযোগ্য অর্থ, মাসিক আয় নয়।
  5. একাধিক সংস্করণ: এক ফাইল ফোনে, আরেকটা কম্পিউটারে — কোনটা সঠিক বোঝা যায় না।
  6. চুক্তির শেষ তারিখ না রাখা: নবায়ন বা ভাড়া বৃদ্ধির সময় পার হয়ে যায়।
  7. ব্যক্তিগত তথ্য অরক্ষিত রাখা: রেন্ট রোলে ভাড়াটিয়ার নাম ও মোবাইল থাকে; শেয়ার করার সময় সতর্ক থাকুন (দেখুন ভাড়াটিয়ার তথ্যের গোপনীয়তা)।

সম্পর্কিত শব্দ

  • লেজার: একটি হিসাবের সব লেনদেনের ধারাবাহিক খাতা।
  • ইনভয়েস: নির্দিষ্ট সময়ের প্রাপ্য বিল।
  • ভ্যাকান্সি রেট: মোট ইউনিটের কত শতাংশ খালি।
  • বকেয়া ভাড়া (Rent Due/Arrears): নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না হওয়া ভাড়া।
  • রেন্টাল ইল্ড: প্রপার্টির মূল্যের তুলনায় বার্ষিক ভাড়া আয়ের হার; দেখুন রেন্টাল ইল্ড হিসাব।

শেষ কথা

রেন্ট রোল কোনো জটিল হিসাববিজ্ঞানের নথি নয় — এটি আপনার প্রপার্টির মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা। একটি সারণিতে সব ইউনিট, ভাড়া, পরিশোধ, বকেয়া আর চুক্তির তারিখ থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। আজই আপনার ভবনের জন্য ছয়টি কলামের একটি সাধারণ রেন্ট রোল দিয়ে শুরু করুন, আর প্রতি মাসের শেষে হালনাগাদ করুন।

বাড়িওয়ালা ERP-তে ভবন, তলা ও ইউনিট অনুযায়ী ভাড়াটিয়া, মাসিক ইনভয়েস ও পরিশোধ রেকর্ড থাকায় বকেয়া তালিকা ও আয়-ব্যয়ের রিপোর্ট আলাদা করে হাতে বানাতে হয় না; খালি ইউনিটের জন্য লিডও সেখানে রাখা যায়। যাদের ইউনিট অনেক, তাদের জন্য হাতে রেন্ট রোল বানানোর সময়টা এতে অনেকটা বাঁচে।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

রেন্ট রোল কী?

রেন্ট রোল হলো নির্দিষ্ট তারিখে কোনো ভবন বা মার্কেটের সব ইউনিটের একটি সারণি, যেখানে ভাড়াটিয়া, মাসিক ভাড়া, চুক্তির মেয়াদ, জামানত, পরিশোধ ও বকেয়া এক নজরে দেখা যায়।

রেন্ট রোল আর লেজারের পার্থক্য কী?

লেজার একজন ভাড়াটিয়া বা একটি খাতের সব লেনদেন তারিখ অনুযায়ী দেখায়, আর রেন্ট রোল নির্দিষ্ট দিনে সব ইউনিটের সারসংক্ষেপ এক সারিতে এক ইউনিট হিসেবে দেখায়।

রেন্ট রোলে কোন কলামগুলো অবশ্যই রাখা উচিত?

ইউনিট নম্বর, ভাড়াটিয়ার নাম, মাসিক ভাড়া, চুক্তির শেষ তারিখ, চলতি মাসের পরিশোধ ও মোট বকেয়া — এই ছয়টি দিয়ে শুরু করা যায়; প্রয়োজনে জামানত, সার্ভিস চার্জ ও মন্তব্য যোগ করুন।

রেন্ট রোল কত দিন পরপর হালনাগাদ করা উচিত?

অন্তত মাসে একবার, আদর্শভাবে প্রতিটি পরিশোধ বা ভাড়াটিয়া পরিবর্তনের পর। প্রতিটি রেন্ট রোলে কোন তারিখ পর্যন্ত তথ্য তা লিখে রাখুন।

খালি ইউনিট কি রেন্ট রোলে রাখতে হয়?

হ্যাঁ। খালি ইউনিট রাখলে খালি হার ও হারানো আয় বোঝা যায় এবং বিজ্ঞাপন বা সংস্কারের পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

ছোট বাড়ির জন্যও কি রেন্ট রোল দরকার?

চার-পাঁচটি ফ্ল্যাটের বাড়িতেও একটি সাধারণ রেন্ট রোল কাজে আসে, বিশেষ করে বকেয়া, চুক্তি নবায়ন ও বছরের আয়ের হিসাব রাখতে।

এক্সেলে কি রেন্ট রোল বানানো যায়?

হ্যাঁ, এক্সেল বা গুগল শিটে সূত্র দিয়ে সহজেই বানানো যায়। ইউনিট বা ভবনের সংখ্যা বেশি হলে রেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার সময় বাঁচাতে পারে।